Tuesday 13 October, 2026

বিএনপি নেতা-এমপিদের স্ত্রী, সন্তান ভাই আত্মীয়রা পেলেন সারের ডিলারশিপ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: 17:18, 12 October 2026

বিএনপি নেতা-এমপিদের স্ত্রী, সন্তান ভাই আত্মীয়রা পেলেন সারের ডিলারশিপ

বিএনপি নেতা-এমপিদের স্ত্রী, সন্তান ভাই আত্মীয়রা পেলেন সারের ডিলার

সারা দেশে নতুন করে সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় সুপারিশ এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আত্মীয়স্বজনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

দেশজুড়ে প্রায় পাঁচ হাজার সার ডিলার নিয়োগের বিপরীতে ৪৭ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়ে। বিপুলসংখ্যক আবেদনকারীর মধ্য থেকে ডিলার বাছাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাদ পড়া ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের একাংশ। তাঁদের অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের স্ত্রী, সন্তান, ভাইসহ অন্য আত্মীয়দের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও দলীয় প্যাডে দেওয়া তালিকার সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত তালিকার নাম ও ক্রমেরও মিল পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুমোদন পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের পাশাপাশি অন্নদানগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর রহমানের মেয়ে জয়িতা আক্তার জিনিও রয়েছেন। তিনি দিনাজপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী। তাঁর প্রতিষ্ঠান জয়িতা সার বিতান নামে ডিলারশিপ পেয়েছে। ইটাকুমারী ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানার শ্বশুর আলিমুদ্দিন ময়েন মোল্লা।

ডিমলা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম রাব্বানী প্রধানের ছেলে তানভির রাফসান ডিমলা সদর ইউনিয়নের ডিলার হয়েছেন। তিনি খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গুদামের আয়তন, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও আর্থিক সক্ষমতার মতো শর্ত যথাযথভাবে যাচাই না করেই প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। 

রাজশাহীতে ৬৯ জন নতুন সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তালিকা বিশ্লেষণ ও মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, তাঁদের অধিকাংশই বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী। তালিকায় বিএনপি নেতাদের স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে ও ভাইয়ের নাম রয়েছে। একজন জামায়াতকর্মীও ডিলারশিপ পেয়েছেন। রাজশাহীর চারঘাট, বাঘা, তানোর, পুঠিয়া, মোহনপুর, পবা, গোদাগাড়ী ও দুর্গাপুরসহ বিভিন্ন এলাকার নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের সদস্যরা রয়েছেন। চারঘাট সদর ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক বুলবুল হোসেনের স্ত্রী জিনিয়া পারভিন। সরদহ ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছেন উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আলমগীর হোসেনের স্ত্রী ইসরাত জাহান। ইউসুফপুর ইউনিয়নে নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম রবিনের স্ত্রী সুরভি আক্তার শিখা। তানোর, পুঠিয়া, পবা ও দুর্গাপুরেও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সন্তান, স্ত্রী, ভাই ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের ডিলারশিপ পাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব নিয়োগে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। 

রাজশাহীর এক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতিটি এলাকার জন্য তিনজনের নাম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও পছন্দের প্রার্থীর নাম তালিকার প্রথমে রাখা হয়। সংসদ সদস্যদের দেওয়া তালিকা থেকেই অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ হয়েছে। এতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বাদ পড়েছেন। 

এদিকে বাগমারার ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার ডিলার নিয়োগ আটকে দিয়েছেন রাজশাহী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল বারী। তাঁর অভিযোগ, দলীয় ব্যক্তিদের ডিলার নিয়োগের চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে কৃষি সচিব ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে চিঠিও দিয়েছেন তিনি। অভিযোগ উঠেছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে তিন সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক ও কৃষি বিভাগের উপপরিচালকের উপস্থিতিতে গোপন বৈঠকে নিয়োগের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। পরে তা কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।

মেহেরপুরে নতুন ২২ জন সার ডিলার নিয়োগ নিয়েও দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বড় অংশ জেলা বিএনপির সভাপতি জাভেদ মাসুদ মিল্টন ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল হাসানের অনুসারী। তাঁদের মধ্যে নেতাদের ছেলে, ভাই, ভাতিজা ও অন্যান্য আত্মীয় রয়েছেন। 

মেহেরপুর পৌরসভায় ডিলার হয়েছেন পৌর বিএনপির সভাপতি আব্দুল লতিফের ছেলে তানভির আহমেদ। সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ফয়েজ মহাম্মদের ভাই এনামুল হক এবং আমদহ ইউনিয়নে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসানের ভাতিজা সাবিক হাসান ডিলারশিপ পেয়েছেন। অন্যান্য ইউনিয়নেও বিএনপি নেতাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়োগ পাওয়ার তথ্য রয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে স্থানীয় সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের ছেলে ও নিকটাত্মীয়দের তিনটি ইউনিয়নে ডিলারশিপ পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গোকর্ণ ইউনিয়নে তাঁর ছেলে আদনান সাদী, নাসিরনগর সদর ইউনিয়নে বোনজামাই আরক মিয়া এবং গোয়ালনগর ইউনিয়নে ভাগ্নের স্ত্রী নুরুন্নাহার আক্তার স্বর্ণা ডিলারশিপ পেয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসনও তাঁদের নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।