Monday 29 June, 2026

চিকিৎসা বাবদ ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ের ব্যাখ্যা দিলেন সাবেক ধর্ম উপদেষ্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: 16:49, 28 June 2026

চিকিৎসা বাবদ ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ের ব্যাখ্যা দিলেন সাবেক ধর্ম উপদেষ্ট

চিকিৎসা বাবদ ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ের ব্যাখ্যা দিলেন সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা

অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন দায়িত্ব পালনকালে তার চিকিৎসা বাবদ ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আজ রবিবার বেলা ১১টায় নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ‘চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে মিডিয়া ফ্রেমিং ও আমার ব্যাখ্যা’ শিরোনামে পোস্টটি করেছেন।

ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, “গতকাল কয়েকটা অনলাইন মিডিয়া পোর্টালে উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকাবস্থায় আমার চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে সংবাদ দৃষ্টিগোচর হয়েছে। উপর্যুক্ত সংবাদের মিডিয়া ফ্রেমিং নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। ফলে, আমার যথাযথ ব্যাখ্যা প্রদান জরুরি বলে মনে করি।

১. চিকিৎসা ব্যয় : বাংলাদেশে মন্ত্রীদের চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়টি 'দ্য মিনিস্টার্স, মিনিস্টার্স অব স্টেট অ্যান্ড ডেপুটি মিনিস্টার্স (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) অ্যাক্ট, ১৯৭৩' অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এই আইনের আওতায় মন্ত্রিসভার সদস্যরা দেশ বা বিদেশে যেকোনও স্থানে চিকিৎসার সম্পূর্ণ খরচ সরকারি কোষাগার থেকে পেয়ে থাকেন।

২. বিদেশে চিকিৎসার নিয়ম : মন্ত্রীদের বিদেশে চিকিৎসার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রক্রিয়া ও নিয়ম অনুসরণ করতে হয়।

মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশ : কোনো মন্ত্রী যদি বিদেশে চিকিৎসা নিতে চান, তবে প্রথমে দেশে একটি উপযুক্ত মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। সেই বোর্ডের চিকিৎসকেরা যদি প্রত্যয়ন করেন যে সংশ্লিষ্ট রোগের প্রয়োজনীয় বা উপযুক্ত চিকিৎসা দেশে সম্ভব নয়, কেবল তখনই বিদেশে চিকিৎসার প্রক্রিয়া শুরু করা যায়।

সরকারপ্রধানের অনুমোদন : মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশের পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা উপদেষ্টার বিদেশে যাওয়ার জন্য সরকারপ্রধানের চূড়ান্ত অনুমোদন নিতে হয়।

বিল বা ভাউচার পেশ : বিদেশে চিকিৎসা শেষ করে দেশে ফেরার পর খরচের প্রকৃত রসিদ, ভাউচার ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিতে হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ যাচাই-বাছাই শেষে সেই বিল সরকারিভাবে পরিশোধ বা সমন্বয় করে।

৩. আমার অবস্থান : আমি মন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হিসেবে বিগত সরকারে নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। ফলে দেশে ও বিদেশে আমার চিকিৎসা ব্যয় আইনানুসারে সরকার বহন করবে।

৪. আমার শারীরিক অবস্থা : আমি দীর্ঘদিন যাবৎ জটিল হৃদরোগে আক্রান্ত। সেইসঙ্গে হাই ডায়াবেটিস (দিনে ৩ বার ইনসুলিন নিই), উচ্চ রক্তচাপ, ও নানাবিধ স্বাস্থ্যগত জটিলতায় ভুগছি। ২০১৫ সালে আমার হার্টে স্টেন্ট (রিং) বসানো হয়। এ যাবৎ ৫ বার আমার এনজিওগ্রাম করা হয়। উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আমি হৃদরোগে আক্রান্ত হই এবং দেশের সরকারি মেডিকেল ও প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাগ্রহণ ও ডায়াগনোসিস করি। রিপোর্টে দেখা যায়, আমার হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণের বোর্ড গঠন করা হয়। লিখিতভাবে আমাকে জানানো হয় ‘ক্যাথেটার এবলেশন’ নামক একটি জটিল অপারেশন করা আবশ্যক এবং এই অপারেশন করার মতো অত্যাধুনিক লেটেস্ট মেশিন ও প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রপাতি দেশে নেই। ফলশ্রুতিতে আবুধাবিতে অবস্থিত একটি মার্কিন হাসপাতাল ও থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসার পরামর্শ দেওয়া হয়। সেখানে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অ্যারেথমিয়া বিশেষজ্ঞ ও সার্জন রয়েছেন।

৫. বিদেশে আমার চিকিৎসা ব্যয় : বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে আমি থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যাই। সেখানে আবারও আমার এনজিওগ্রাম করানো হয় এবং ডায়াগনোসিস করে অপারেশন করার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু পরীক্ষায় দেখা যায়, আমার হৃৎপিণ্ডের দেয়ালে জমাট রক্তকণা লেগে আছে। চিকিৎসক জানালেন, প্রথমে চিকিৎসার মাধ্যমে এটা অপসারণ করতে হবে; এরপর অপারেশন। অপারেশন না করালে রক্তজমাট বেঁধে ব্রেইন স্ট্রোক ও হার্টফেল করার আশঙ্কা আছে। এদিকে, পবিত্র হজের সময়ও নিকটবর্তী। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে হজের দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে আমি দেশে ফিরে আসি। এটুকু পর্যন্ত আমার চিকিৎসা বাবদ ব্যয় হয় প্রায় ১৭ লাখ টাকা, যার প্রতিটা ব্যয়ের রশিদ ও ভাউচার আমি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিয়েছি।

৬. অপারেশন ব্যয় : পবিত্র হজের দায়িত্ব পালন শেষে আবারও অসুস্থতা অনুভব করায় আমি দেশের ডাক্তারদের শরণাপন্ন হই এবং তারা দ্রুত অপারেশনের পরামর্শ প্রদান করেন। বিগত জানুয়ারি মাসে আমার অপারেশন সম্পন্ন হয় এবং বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে বিল দিই প্রায় ৬৫ লাখ টাকা। যদিও বিল আরও বেশি আসে, কিন্তু থাইল্যান্ডের বাংলাদেশ দূতাবাসের অনুরোধে কিছু ডিসকাউন্ট পাওয়া যায়। আমি বাংলাদেশ দূতাবাসের কাছে কৃতজ্ঞ। এ সংক্রান্ত সমস্ত বিলের কপি আমি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মন্ত্রীপরিষদ বিভাগে জমা করি।

৭. সরকার কর্তৃক বিল প্রদান : আইনানুসারে সরকার কর্তৃক মন্ত্রী/উপদেষ্টার চিকিৎসার সমস্ত খরচ সরকার বহন করবে। সরকার শুধুমাত্র আমার হাসপাতালের বিল, অপারেশন বিল ও মেডিসিনের ব্যয় বহন করেছে। প্রকৃতপক্ষে আমার পরিচর্যার জন্য সঙ্গে যাওয়া আমার সহযাত্রীর সমস্ত খরচ আমি বহন করেছি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমার হোটেলে বসবাসের বিল, খাওয়ার বিল, যাতায়াত খরচও ব্যক্তিগতভাবে বহন করেছি। সরকার প্রদত্ত প্রতিটি পয়সার প্রকৃত বিল, ভাউচার, রিসিপ্ট আমার কাছে সংরক্ষিত আছে। যে কেউই চাইলে হাসপাতাল ও কর্তৃপক্ষের কাছে এসব ব্যয়ের ব্যাখ্যা অনুসন্ধান করতে পারবেন।

আমি উপদেষ্টা হিসেবে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে এবং নির্লোভ ও নির্মোহভাবে দায়িত্ব পালনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। সরকারি কোনো অর্থ আত্মসাৎ কিংবা তছরুপ করা থেকে নিজেকে বিরত রেখেছি। আইনমতে, যতটুকু আমার প্রাপ্য তাও গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছি। কিন্তু কিছু মিডিয়া বৈধ, নিয়মতান্ত্রিক ও আইনগত বিষয়গুলোকে এমনভাবে ফ্রেমিং করছে যেন জনমানসের মনে শঙ্কা ও সন্দেহ তৈরি হয়। আমি এসব সংবাদ ও মিডিয়া ফ্রেমিংয়ের তীব্র নিন্দা জানাই। আল্লাহ তা’আলা সবাইকে সহি বুঝ দান করুন।

 

News Editor : Shahrina Sharmin