Sunday 11 October, 2026

শাহবাগ এলাকায় ৯ মাসে ৬৫ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: 11:04, 10 October 2026

শাহবাগ এলাকায় ৯ মাসে ৬৫ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার

শাহবাগ এলাকায় ৯ মাসে ৬৫ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পেছনে দেয়ালঘেঁষা একটি ফাঁকা জায়গায় পড়ে ছিলেন আনুমানিক ৪০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি। গত ৬ অক্টোবর বিকেল ৫টার দিকে তাঁর ডান পায়ের গোড়ালিতে ব্যান্ডেজ দেখা যায়। আশপাশ দিয়ে অসংখ্য মানুষ চলাচল করলেও কেউ তাঁর খোঁজ নিচ্ছিলেন না। তিনি কোথা থেকে এসেছেন, তাঁর পরিবারের পরিচয় কী—এসব তথ্যও জানতেন না আশপাশের লোকজন। কথা বলার চেষ্টা করেও তাঁর কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

ওই ব্যক্তি যেখানে শুয়ে ছিলেন, সেখান থেকেই সেদিন সকালে একজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। একই দিন কাছাকাছি আরেকটি স্থান থেকে উদ্ধার করা হয় আরও একজনের মরদেহ। তিনিও ছিলেন অজ্ঞাতপরিচয়। পুলিশের ধারণা, অসুস্থতাজনিত কারণে তাঁদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।

শুধু এই দুজনই নন, শাহবাগ থানাধীন এলাকায় গত এক মাসে অন্তত ১৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের কারও পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। পরে বেওয়ারিশ হিসেবে তাঁদের দাফন করা হয়েছে।
‎
‎স্থানীয়রা জানান, ঢাকা মেডিকেলের আশপাশসহ এই এলাকায় বিপুলসংখ্যক ভাসমান মানুষ থাকে। পুরো শাহবাগ এলাকায় এমন মানুষের সংখ্যা অনেক। এর মধ্যে আছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট এলাকা, চাঁনখাঁরপুল ও হাইকোর্টের মাজার, দোয়েল চত্বর ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। 
‎
‎পুলিশের তথ্যমতে, ঢাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ পাওয়া যায় শাহবাগ এলাকায়। গত ২৯ সেপ্টেম্বর এ এলাকায় এক দিনে তিনজনের মরদেহ পাওয়া যায়। আগের দিন ২৬ সেপ্টেম্বর একই এলাকা থেকে চারজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়। 
‎
‎রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এ এলাকায় সরকারি-বেসরকারি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান আছে। জায়গাটি একই সঙ্গে পরিচয়হীন মানুষের ঠিকানাও। মৃত্যুর পর যাদের অধিকাংশের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে না।
‎
‎শাহবাগ থানা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে শাহবাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও আশপাশের এলাকা থেকে ৭৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। ৬৫ জনের পরিচয় মেলেনি। এর আগে ২০২৫ সালে ৮১টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে পরিচয় শনাক্ত হয় ১৩ জনের। গত ২১ মাসে উদ্ধার হওয়া ১৬০টি মরদেহের মধ্যে পরিচয় মিলেছে ২৭টির। পরিচয়হীন থেকে গেছেন ১৩৩ জন, যা শতকরা হিসাবে অজ্ঞাতনামা ৮৩ শতাংশ। 
‎
‎এদিকে ডিএমপির তথ্য মতে, ২০২৫ সালে ঢাকা মহনগর পুলিশের আট বিভাগে ২১৪টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৮১টি হয়েছে রমনা বিভাগে, যার বেশির ভাগই শাহবাগ থানাধীন এলাকার। অন্য বিভাগগুলোর মধ্যে তেজগাঁওয়ে ৫১টি, ওয়ারীতে ২১, লালবাগে ১৭, মতিঝিলে ১৭, মিরপুরে ১২, উত্তরায় ৯ এবং সবচেয়ে কম গুলশানে ৬টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আর চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ঢাকা মহানগরীতে ৭৬টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৩১টি রমনার এবং অধিকাংশই শাহবাগ এলাকার। এর পরের স্থান মতিঝিলের ১৪টি। তারপর ওয়ারী ১৩টি।
‎
‎পুলিশের তথ্য ও মরদেহের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, মারা যাওয়া ব্যক্তিদের অধিকাংশের বয়স ৪০ বছরের বেশি। তাদের বড় একটি অংশ মাদকাসক্ত। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়া, দীর্ঘদিন চিকিৎসার বাইরে থাকা এবং শরীরে পচন ধরার মতো জটিলতায়ও অনেকের মৃত্যু হয়েছে।
‎
‎পুলিশ ও চিকিৎসকরা জানান, অজ্ঞাতপরিচয় মানুষগুলো মূলত ভাসমান। তাদের নিয়মিত চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য নেই, পুষ্টিকর খাবারও খেতে পারে না। দেখা যায়, ঠান্ডাজনিত রোগ, বার্ধক্যজনিত জটিলতা বা অন্যান্য অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়ে তুলনামূলক কম বয়সে তারা মারা যান।
‎
‎ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক সমকালকে বলেন, গৃহহীন, পারিবারিকভাবে বিচ্ছিন্ন, মানসিকভাবে অসুস্থসহ মানুষ নানা কারণে ভবঘুরে হয়, সড়কে আশ্রয় নেয়। রাজধানীতে এসব মানুষের পরিচয় বা তালিকা সরকারের পক্ষ থেকে করা প্রয়োজন। এতে একদিকে তারা কোনো অপরাধে জড়িয়ে গেলে তা যেমন চিহ্নিত করা সম্ভব, অন্যদিকে মৃত্যুর পরও তাদের পরিচয় জানা ও স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সহজ হবে। এটি সরকারের অন্যতম জনকল্যাণমূলক দায়িত্ব। 
‎
‎গত দুই মাসে শাহবাগ এলাকার ভাসমান লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শাহবাগ এলাকায় পুলিশের তৎপরতা কম থাকায় জায়গাগুলোকে নিরাপদ মনে করেন তারা। এ ছাড়া হাইকোর্ট ও দোয়েল চত্বরের পাশের মাজারে দিনে দুবেলা বিনামূল্যে খাবার পাওয়ায় এসব এলাকায় থাকেন অনেকে। খাবারের জন্য জাতীয় স্টেডিয়াম, পুরান ঢাকা ও কমলাপুর থেকেও অনেকে আসেন।
‎
‎জাতীয় ঈদগাহের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে শাহ খাজা শরফুদ্দীন চিশতির (রহ.) মাজারের (হাইকোর্ট মাজার) পক্ষ থেকে প্রতিদিন রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়। সেখানে আগে থেকেই ভিড় করে ভবঘুরে ও ভাসমান মানুষ।
‎
‎মাজারের বাবুর্চি মো. নাজমুল হোসেন সমকালকে জানান, প্রতিদিন দুপুরে ও সন্ধ্যায় প্রায় ৫০০ জনের খাবার রান্না করে দেওয়া হয়। এর মধ্যে অর্ধেকই থাকে ভবঘুরে প্রকৃতির মানুষ। তারা আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে জড়ো হন।
‎
‎এ ছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আশপাশে অস্থায়ী খাবারের দোকান, অমর একুশে হল ও আবাসিক এলাকার সামনে আনন্দ বাজার থেকে ভবঘুরে লোকজন খাবার সংগ্রহ করেন। তাই এসব এলাকায় অনেকে থাকেন।
‎
‎দোয়েল চত্বরের পাশে ঢাকা গেটে সাগর নামে মধ্যবয়সী এক ভবঘুরে জানান, পরিবার ছেড়ে পাঁচ-ছয় বছর ধরে দোয়েল চত্বরের আশপাশে থাকেন। এ সময়ে তাঁর আশপাশে থাকা সাত-আটজন মারা গেছেন। সারাদিন ওই এলাকাতেই থাকেন। তিনিসহ তাঁর মতো সবাই পাশের মাজার থেকে খাবার খান। হাইকোর্টের মাজার গেটে নূর আলম নামের এক ভবঘুরে বলেন, ‘কোনো কাজ করি না। মাজার থেকে খাবার খাই।

‎ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পাশে জাহাঙ্গীর আলম জানান, তিনি অনেক দিন ধরে অসুস্থ। বেশি নড়াচড়া করতে পারেন না। খাবার দেন আশপাশের দোকানিরা।