ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ট্রাম্পের নগ্ন সোনালি মূর্তি
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ভেতরে ব্যস্ত চলাচলের একটি পথে স্থাপন করা হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাড়ে ৮ ফুট উঁচু একটি নগ্ন সোনালি মূর্তি। মঙ্গলবার মূর্তিটি উন্মোচন করা হয়। ২৩ ক্যারেট সোনার পাতের পাতলা আবরণে মোড়ানো তামার তৈরি এই ভাস্কর্যটির নাম ‘দ্য অরেঞ্জ প্লেগ’ বা ‘কমলা রঙের মহামারি’। ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আনুষ্ঠানিক কেন্দ্রস্থলে এটি স্থাপন করা হয়েছে।
মূর্তিটির নির্মাতা ডেনিশ শিল্পী জেন্স গালশিওট ফোনে বলেন, ‘ট্রাম্প সোনা পছন্দ করেন। আমার মনে হয়, একদিক থেকে দেখলে তিনি হয়তো এই ভাস্কর্যটি পছন্দই করবেন।’
ভাস্কর্যটিকে ‘কিং অব ইনজাস্টিস’ বা ‘অন্যায়ের রাজা’ নামেও অভিহিত করা হচ্ছে। এতে দেখা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট এক দুর্বল ও ছোটখাটো গড়নের মানুষের কাঁধে চড়ে আছেন। তার উরু ও ঝুলে পড়া পেট ওই ব্যক্তির মাথাকে শক্তভাবে জড়িয়ে আছে। হাতে রয়েছে একটি লম্বা গলফ ক্লাব ও ন্যায়বিচারের প্রতীক দাঁড়িপাল্লা।
মূর্তিটির বেদিতে লেখা রয়েছে, ‘আমি এক ব্যক্তির পিঠে চড়ে বসে আছি। আমার ভারে সে তলিয়ে যাচ্ছে। তাকে সাহায্য করার জন্য আমি সবকিছুই করব—শুধু তার পিঠ থেকে নামা ছাড়া।’
গালশিওটের মতে, পরিবেশ এবং নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্টের হুমকি তিনি যেভাবে দেখেন, এই শিল্পকর্ম তারই প্রতীক। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প আমার বিশ্বাস ও আদর্শের পরিপন্থী সব কিছুই ধ্বংস করছেন।’
তবে এটি সরাসরি ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো নিন্দা বা ভর্ৎসনা নয়। প্রদর্শনীর উদ্যোক্তা ডেনিশ রাজনীতিবিদ পার ক্লাউসেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা পার্লামেন্ট চত্বরে প্রদর্শনীর আয়োজন করতে পারেন, তবে প্রতিটি প্রদর্শনী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনুমোদন পেতে হয়। পার্লামেন্টের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো অনুষ্ঠান বা প্রদর্শনী ‘আপত্তিকর, উসকানিমূলক বা ইউনিয়নের ভিত্তিস্বরূপ মূল্যবোধের পরিপন্থী’ হলে কিংবা ‘পার্লামেন্টের মর্যাদাহানি ঘটায়’ এমন হলে তা নিষিদ্ধ করা যেতে পারে।
প্রদর্শনীর অনুমোদনের অর্থ এই নয় যে এতে উপস্থাপিত বিষয়বস্তুকে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন করছে। তবে গালশিওট, যিনি আশঙ্কা করেছিলেন তাঁর আবেদন বাতিল হতে পারে, এই অনুমতিকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যদের এক ধরনের পরোক্ষ সমর্থন হিসেবে দেখছেন।
তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় অনেক আমেরিকানই বলেন, “ঠিক আছে, ইনিই আমাদের প্রেসিডেন্ট, তবে একদিক দিয়ে তিনি হাস্যকরও বটে।” আর আমার ধারণা, অধিকাংশ ইউরোপীয়ও তাঁকে এভাবেই দেখেন।’
গালশিওট তার প্ররোচনামূলক রাজনৈতিক শিল্পকর্মের জন্য পরিচিত। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ ‘পিলার অব শেম’ বা ‘লজ্জার স্তম্ভ’। ১৯৮৯ সালের তিয়ানানমেন স্কয়ার হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে নির্মিত এই ভাস্কর্যটি ২০২১ সালে হংকংয়ের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল।
ট্রাম্পকে নগ্নভাবে চিত্রিত করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে গালশিওট বলেন, হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের ‘দ্য এম্পেরর’স নিউ ক্লোদস’ বা ‘সম্রাটের নতুন পোশাক’ গল্প থেকে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন। ওই গল্পে এক অহংকারী সম্রাট নগ্ন অবস্থায় শহরে শোভাযাত্রা করেছিলেন। গালশিওট বলেন, ‘একনায়করা পছন্দ করেন না যে কেউ তাঁদের নিয়ে হাসাহাসি করুক।’
অস্থায়ী এই প্রদর্শনীটি বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চালু থাকার কথা রয়েছে। এর সঙ্গে মূল ভাস্কর্যটির ১ হাজারের বেশি ত্রিমাত্রিক মুদ্রিত ক্ষুদ্র সংস্করণও রয়েছে, যা পথচারীদের মধ্যে ‘প্রতিবাদের প্রতীক’ হিসেবে বিতরণ করা হচ্ছে।
প্রদর্শনীর উদ্যোক্তা ক্লাউসেন ডেনমার্কের সমাজতান্ত্রিক দল ‘রেড-গ্রিন অ্যালায়েন্স’-এর সদস্য। ২০২৪ সালে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হওয়া ক্লাউসেন ‘দ্য লেফট’ নামের একটি বামপন্থী গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এই গোষ্ঠীটি মোট আসনের প্রায় ৬ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।
স্ট্রাসবুর্গ থেকে ফোনে ক্লাউসেন বলেন, ‘আমার মনে হয়, বিশ্বজুড়ে ক্ষমতা এবং সেই ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে আমাদের আলোচনা করা প্রয়োজন। ট্রাম্পের কার্যকলাপ ইউরোপের মানুষের জন্য অত্যন্ত বড় একটি সমস্যা। আমি ইউরোপে এমন একটি আলোচনার সূত্রপাত করতে চাই যে, কীভাবে আমরা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নিজেদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে পারি এবং কীভাবে এমন রাজনীতি গড়ে তুলতে পারি যা তাঁর ওপর নির্ভরশীল নয়।
News Editor : Abul Hasnat Milton








