Wednesday 04 November, 2026

ফের কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু, কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় বাড়ছে উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: 23:11, 3 November 2026

ফের কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু, কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় বাড়ছে উদ্বেগ

ফের কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু, কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায়

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নিরাপত্তা হেফাজতে আওয়ামী লীগের ৪৩ নেতা-কর্মীর মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন এমএসএফ। এর মধ্যে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই মারা গেছেন ১৭ জন। নওগাঁ জেলা কারাগারে বন্দি অবস্থায় মারা গেছেন বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন নবাব (৫৮)।

আজ মঙ্গলবার সকালে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর নওগাঁ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কারাগারে নির্যাতন, যথাযথ চিকিৎসা না দেওয়া এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ আড়াল করার অভিযোগ উঠেছে।

জাকির হোসেন নবাবের মৃত্যুর বিষয়ে প্রকাশিত সংবাদে কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হচ্ছে, সকালে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় এবং হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। নওগাঁ জেলা কারাগারের জেল সুপার রত্না রায় জানিয়েছেন, বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় তিনি বন্দি ছিলেন। সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

তবে তাঁর মৃত্যুর বিষয়ে পরিবারের পক্ষের অভিযোগ এবং কারাগারের ভেতরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর স্বাধীন তদন্ত এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।

জাকির হোসেন নবাব বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক দপ্তর সম্পাদক ছিলেন। তিনি বগুড়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক এবং জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২০ জুন রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি মবের শিকার হন তিনি। সেখানে তাঁকে লাঞ্ছিত করার পর ভাটারা থানার পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

প্রথমে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হলেও পরবর্তী সময়ে তাঁকে বগুড়া জেলা কারাগার এবং সেখান থেকে নওগাঁ জেলা কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।

তাঁর মৃত্যুর বিষয়ে স্বজন ও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে যে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, তা আরও গুরুতর। অভিযোগ অনুযায়ী, কারাগারে নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়নি।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে, মৃত্যুর পর ঘটনাটি আড়াল করতে জেল হাসপাতালের অন্য একজন সুস্থ কয়েদির ইসিজি জাকির হোসেন নবাবের নামে করা হয়েছিল। সেই স্বাভাবিক ইসিজির রিপোর্ট ব্যবহার করে তাঁকে নওগাঁ সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

তবে ইসিজি-সংক্রান্ত এই অভিযোগ, কারাগারে নির্যাতন এবং চিকিৎসা না দেওয়ার বিষয়গুলো এখন পর্যন্ত স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কারা কর্তৃপক্ষও এসব অভিযোগ স্বীকার করেনি। ফলে কারাগারের চিকিৎসা নথি, ইসিজি রিপোর্ট, হাসপাতালের রেকর্ড এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ করা জরুরি।

জাকির হোসেন নবাবের মৃত্যু বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা কি না, তা বুঝতে সাম্প্রতিক সময়ের কারা ও নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যুর পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের ১৭ জুলাই ২০২৬-এর একটি প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এমএসএফের তথ্যের ভিত্তিতে ডয়চে ভেলে, ১৭ জুলাই ২০২৬। ৪৩ জনের হিসাব পুলিশ ও কারা—উভয় ধরনের নিরাপত্তা হেফাজতকে অন্তর্ভুক্ত করে; সবাই কারাগারে মারা গেছেন, এমন নয়।

এমএসএফের এই পরিসংখ্যানের বিষয়ে মানবাধিকারকর্মী নূর খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি সন্দেহ তৈরি করছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের একটি বড় অংশের মৃত্যুর ঘটনায় আটক বা জিজ্ঞাসাবাদের সময় বলপ্রয়োগ এবং কারাগারে চিকিৎসা না দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এসব ঘটনার স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
 

News Editor : Shahrina Sharmin