নিদানকালের বিবেক
দুনিয়ার যেখানেই যাই, সেখানেই খুঁজি বাঙালি, বাংলাদেশের উৎসব ও অনুষ্ঠান। এবারে সিডনিতে এসেই শুনি জনাব সিরাজুস সালেকিনের একক গানের অনুষ্ঠান আছে। খুব আগ্রহ ছিল অনুষ্ঠানটি দেখার। তখনও তাঁকে চিনি না, নাম শুনেছি, শুনেছি তিনি কুলীন সংস্কৃতি সংগঠক। তাঁর প্রয়াত পিতা আব্দুল লতিফ এক অনন্য সংস্কৃতিসাধক, যার প্রখর আলো ও ছায়া পুত্র হিসেবে তিনি ধারণ করেছেন। আব্দুল লতিফের নাম উঠলেই সেই ভরাট কণ্ঠের ‘ওরা আমার মুখের কথা কাইড়া নিতে চায়’ কানে বাজে।
পিতার মতো সঙ্গীত পেশা না হলেও সিরাজুস সালেকিন একজন বিদগ্ধ শিল্পী, সংগঠক ও সঙ্গীতের শিক্ষক। ছাত্রজীবনে সঙ্গীতচর্চার পাশাপাশি ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে হেঁটেছেন, নেতৃস্থানীয় ছিলেন। পঁচাত্তরে চেপে বসা হিমশীতল বরফ সরাতে উদীচীকে ধরে সাংস্কৃতিক লড়াই করেছেন। একদা ছায়ানটের শিক্ষকও ছিলেন। ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি সংসদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। সেই তিনি সিডনিতে গড়ে তুলেছেন ‘প্রতীতি’ নামে একটি সংস্কৃতি সংগঠন, যা গত তিন দশক ধরে প্রবাসে শুদ্ধ সংস্কৃতির লালন ও প্রসারে কাজ করে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, সংগঠনটি সিডনিতে আমাদের রক্তধারায় গড়ে ওঠা প্রজন্মকে বাংলাদেশ ও বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ করে তুলছে।
সেই প্রতীতি ও গুণীজন সিরাজুস সালেকিনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ঘটে ১১ এপ্রিল ২০২৬, সিডনির Wentworthville-এর Redgum Function Centre-এ প্রতীতির বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে। আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের পণ্ডিত, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি শহিদ ড. সামসুজ্জোহার সঙ্গে পাকিস্তানি বুলেটে আহত ও ভাগ্যগুণে বেঁচে যাওয়া প্রফেসর ড. আব্দুল খালেকের পুত্র ফয়সাল খালিদ শুভ। শুভ ও তাঁর স্ত্রী নওরোজ খালিদ বর্ণী প্রতীতির শিল্পী ও সংগঠক।
আমি জনাব সিরাজুস সালেকিনের সেই একক অনুষ্ঠান মিস করেছিলাম। আমন্ত্রণপত্রে উল্লেখিত সময়ের ত্রিশ মিনিট পর রওনা দেওয়ায় সিডনির প্রবীণ বাঙালি গামা আব্দুল কাদির জানান—এখন গিয়ে অনুষ্ঠান ধরতে পারবেন না! আমি বললাম—বাঙালির সময়নুবর্তিতা তার পাঞ্জাবি, লুঙ্গি আর ধুতির মতোই ঢিলেঢালা। অনুষ্ঠান পেয়ে যাব, চলেন। তিনি বললেন—অন্য কারো অনুষ্ঠান হলে তাই হতো, কিন্তু সালেকিনের অনুষ্ঠান তো এক মিনিটও বিলম্ব হবে না। পাঁচজন দর্শক হলেও সে অনুষ্ঠান শুরু করবে। বুঝেছি, ঢিলেঢালা বাঙালির ব্যতিক্রম সিরাজুস সালেকিনের সময়নুবর্তিতা।
১১ এপ্রিলের অনুষ্ঠানটি ছিল একদম ঘড়ি ধরে। একচুল এদিক-ওদিক নেই। মিলনায়তন ছিল কানায় কানায় পূর্ণ, আগতরা আগেই আসন নিয়েছেন। পিনপতন নিস্তব্ধতা ভেঙে ভরাট কণ্ঠে উপস্থাপক হয়ে মঞ্চে দাঁড়ালেন তিনি। মিনিট পাঁচেকের সূচনা বক্তব্য। তাতে তিনি যা বলছেন, তা ইউনূসের শাসনামলে বাংলাদেশে হলে অনুষ্ঠানটি অক্কা পেয়ে যেত নির্ঘাত। উপস্থাপকের উচ্চারণে বৈশাখবরণের আনন্দ ছিল না, বরং একটা বিষাদ তাঁকে ঘিরে ছিল। তিনি বলছিলেন—আমরা যখন অনুষ্ঠান করছি, তখন বাংলাদেশে মাজার আক্রান্ত হচ্ছে, বাউলশিল্পীরা নিগৃহীত হচ্ছেন। ছায়ানট, উদীচী আক্রান্ত, আগুনে পুড়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সূতিকাগার ধানমন্ডি বত্রিশের ঐতিহাসিক বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, স্বাধীনতাবিরোধীদের উন্মত্ত উল্লাস চলছে। মঞ্চের ব্যাকস্ক্রিনে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বত্রিশ, পুড়ে যাওয়া উদীচী, লুট ও আক্রান্ত হওয়া ছায়ানটের করুণ ছবিগুলো সাঁটিয়ে দেওয়া হয়েছে। যা সময়ের সাহসী উপস্থাপনা। দেখে মনে হলো যেন ষাটের দশকের সাহসী সংস্কৃতি সংগঠনগুলোর মঞ্চ সেটি।
অনুষ্ঠানে যারা এসেছেন তারা একদলভুক্ত নন। এসেছেন—বিক্ষুব্ধ মুক্তিযোদ্ধা, কেউ বিএনপি, কেউবা আশাহত বা বিচ্যুত বামপন্থি, কেউ মুখর আওয়ামী লীগ বিরোধী, কেউবা বুকে পাথর চেপে নীরবে ও সরবে থাকা আওয়ামী লীগ, এছাড়াও অজয় দাশগুপ্ত, ড. সুলতান মাহমুদ, বিসিএ এর শেখ শামীমের মতো অনেক লেখক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও সংগঠক। সকলেই নীরব। দর্শকরা নানা দলের, কিন্তু একটা জায়গায় ভীষণ মিল দেখলাম—তাঁরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো ব্যথাতুর কথাগুলো শুনছেন। তারা সকলেই নির্বাক! যেন পাথরচাপায় পড়েছে তাদের নিঃশ্বাস। সিরাজুস সালেকিনের ইতিহাসঘনিষ্ঠ ছোট্ট বক্তব্য শেষ হতেই সেই নীরব দর্শকরা তালির প্রবল শব্দে উপস্থাপকের কথাগুলোকে সমর্থন দিলেন। ঘৃণা দেখালেন দেশে সংস্কৃতি ও স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কৃত কাজগুলোকে। যা দেখে মনে হলো বিভ্রান্ত বাঙালি আবার এক জায়গায় একত্রিত হয়েছে।
২০২৪ সালে কোটার নামে গড়ে ওঠা আন্দোলন ভুল বা শুদ্ধ যে ধারণা থেকেই হোক, তাতে অনেকেই যুক্ত হয়েছেন, যাদের বড় অংশই আজ আশাহত। এ সময়কালে দেশের মুক্তিযুদ্ধ, শিক্ষা ও সংস্কৃতি হাতছাড়া হতে বসেছে। সেদিন দর্শক-শ্রোতারা সকলেই একসূতোয় বাঁধা পড়েছিলেন। দেখলাম ‘প্রতীতি’ সকলকে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় একলাইনে দাঁড় করাতে চেষ্টা করছে। এই মুহূর্তের এটিই বড় কাজ।
একটি আন্দোলন শুদ্ধ নাকি ষড়যন্ত্র—তার মূল্যায়ন নিশ্চয়ই প্রয়োজন রয়েছে। তার মানে এই নয়, আপনি মূল্যায়ন না হওয়া অবধি হাত-পা গুটিয়ে অনৈক্যে বসে থাকবেন। আপনার কিংকর্তব্যবিমূঢ়তার সুযোগে সংস্কৃতি ও স্বাধীনতাবিরোধীরা সাধুবেশে গিলে ফেলছে মুক্তিযুদ্ধ ও সংস্কৃতিকে। একটা সরকার বদলের অভ্যুত্থানকে মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে বড় উচ্চতা দিচ্ছে। ত্রিশ লক্ষ শহিদের আত্মদানকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হচ্ছে। গৌণ করা হচ্ছে বাংলাদেশের জন্মকে!
রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মতোই সংস্কৃতিকর্মী ও সংগঠনগুলো আগুনে পুড়ছে। বাউলরা সর্বত্র আক্রমণের শিকার। কনসার্ট ও সাংস্কৃতিক মঞ্চ ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, ফকির লালন সে আক্রমণ থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ এরকম নির্যাতনের শিকার পাকিস্তান যুগে বহুবার হয়েছেন। নজরুলেও ছিল তাদের বিষোদ্গার।
পহেলা বৈশাখ মুসলমানের না হিন্দুর, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নাকি শুধু ‘শোভাযাত্রা’, রবীন্দ্রনাথ জ্ঞান না পাপের উৎস—এগুলো আমাদের সামনে হাজির। কেউ কেউ ত্রিশ লক্ষ জীবনের দামে কেনা স্বাধীনতাকে অনর্থক বলছেন! যুদ্ধ নয়, বলছে—ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া! যা এখনো মিটিয়ে ফেলা যায়! এই বলাগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ভাবলে সরলীকরণ হবে। যারা এগুলো বলছে, তারা পাকিস্তান যুগেও রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে ছিল। পঞ্চকবির বিরুদ্ধে ছিল। পহেলা বৈশাখ, রবীন্দ্র-নজরুল-জীবনানন্দ আজ পাপের পড়া। অভিযোগ রয়েছে-অনিচ্ছায় জাতীয় সংগীতের পাঠ ছাড়া রবীন্দ্রনাথসহ সকল অমুসলিম কবি নিষিদ্ধ পাঠের আওতায় দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ছায়ানট-উদীচী যেন নিষিদ্ধ পল্লী, পাপ উৎপন্নের শিখা অনির্বাণ। মাজারভিত্তিক বাউল সাধনাও আঘাতের লক্ষবস্তু। ২০২৪-এর আগস্ট থেকে অসংখ্য মাজার, বাউলের আখড়া আগুনে দগ্ধ হয়েছে। অনেক বাউল জীবনও দিয়েছেন। কাউকে কবর থেকে তুলে এনে দাহ করা হয়েছে। সংস্কৃতি ও ইতিহাসখেকো ড. ইউনূস রিসেট বাটন টিপে খেয়ে ফেলেছে ধানমণ্ডি বত্রিশসহ অনেকগুলো ঐতিহ্য। এই যখন আমাদের দেশের ভেতরের অবস্থা, তখন আশা জাগানিয়া খবর হচ্ছে—তেপান্তরের আমেরিকায় বাঙালির পহেলা বৈশাখের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিলেছে।
২২ এপ্রিল ২০২৬ নিউইয়র্ক স্টেট সিনেট একটি রেজুলেশন গ্রহণ করেছে, ১ বৈশাখ বাংলা নববর্ষ হিসেবে ১৪ এপ্রিলকে বাংলা নিউ ইয়ার ডে হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে। এটি বিশ্বপরিমণ্ডলে বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি। বাংলা নববর্ষ ঐতিহ্যবাহী ও অসাম্প্রদায়িক উৎসব, যেখানে নানা সাজে সঙ্গীত, সাহিত্য ও নৃত্যকলার মাধ্যমে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ উদযাপন করেন। বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যগুলো যখন নিজ ভূমিতেই ডুবতে বসেছে বাধার মুখে, তখন পহেলা বৈশাখের স্বীকৃতি বাঙালির ও বাংলার সাংস্কৃতিক পথচলায় আলোর পথরেখা হিসেবে কাজে দেবে।
অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে কুশল সংস্কৃতি ও পোশাক সংস্কৃতির ব্যাপক বদল হয়েছে। সভা-সমাবেশে ‘উপস্থিত সুধী মণ্ডলী’র স্থলে ‘আজকের উপস্থিতি’ যুক্ত হয়েছে। ধর্মীয় মোড়কে বাংলাদেশ ও তার হাজার বছরের সংস্কৃতিকে গিলে ফেলা হয়েছে। এ পরিবর্তন শুধু বহিরাবরণ ও বাক্যেই সীমাবদ্ধ নয়, অন্তরেও সাধিত হয়েছে। আজকে বন্ধুত্ব গড়ার আগে অনেকেই ভাবেন ব্যক্তিটির ধর্মীয় পরিচয় কী।
এরকম অন্ধকার ও বাকরুদ্ধ পরিস্থিতি থাকলে ইতিহাস, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতি একসময় কালের গহ্বরে হারিয়ে যাবে। সংস্কৃতি নিয়মিত চর্চার মধ্য দিয়ে টিকে থাকে। নদীতে যেমন স্রোত না থাকলে নদী হারিয়ে যায়, সংস্কৃতিও তেমন—এর প্রবাহ বা চর্চা না থাকলে সেও মরে যাবে। যা চায় মৌলবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীলরা।
আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অবলম্বন করে টিকে থাকার বিকল্প নেই। এ কথা তো অসত্য নয়, যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে তারা বাঙালির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। যারা পঞ্চকবির বিরুদ্ধে, সুকান্তের বিরুদ্ধে, শরৎচন্দ্রের বিরুদ্ধে—খুঁজে দেখুন তাদের কুষ্ঠি, তারা মনের গহীনে বাংলাদেশেরও বিরুদ্ধে।
মৌলবাদ লক্ষ্য নির্ধারণে ভুল করেনি। তারা সংস্কৃতিকে টার্গেট করেছে। তারা জানে, বাঙালি সংস্কৃতিকে ঠেকিয়ে রাখা মানে বাংলাদেশকে পিছিয়ে ভুল পাঠে জাতি গড়ে তোলা, যা জাতি ও সংস্কৃতির বিনাশ বা হত্যাকরণ।
২৬ মে ২০২৪ আমারই লেখা ‘দিনগুলো সব এলোমেলো’ শীর্ষক কবিতার অংশবিশেষ উদ্ধৃত করে নিবন্ধটি শেষ করি—
দিনগুলো সব এলোমেলো
মেলে না কারো সাথ
নজরুল আজ অপাঙ্ক্তেয়
অতীত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ!
এই কষ্ট মেলাই কেমনে
মেলাই বা কার সাথ
হারমোনিয়াম রাখলে ঘরে
যাচ্ছে নাকি কারো জাত!
তবলা ছুঁলে পাপের হাঁড়ি
দোতারায় নরকবাস
এগুলোই আজ মগজ জুড়ে
সব হয়েছে সর্বনাশ।
বাঙালি জাতির এই সংকটকালে প্রয়োজন ভাষা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ধারায় সংস্কৃতির জাগরণ। যে জাগরণে সিডনিতে প্রতীতি, সিরাজুস সালেকিন, একুশে একাডেমি, বইমেলা, বৈশাখী মেলা, নিউইয়র্কে- মহিতোশ তালুকদার তাপস, বিশ্বজিৎ সাহা, ড. নূরুন নবী, লণ্ডনে আনন্দধারার ডা. ইমতিয়াজ আহম্দ, দেশে নানান বাউল, সংস্কৃতি সংগঠক মফিদুল হক, ডাঃ সারওয়ার আলী, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, লাইসা আহমদ লিসা, ভূপতি ভূষণ, ছায়ানট, ভাওয়াইয়া, লালন, কুষাণ, গম্ভীরা, হাসন রাজার গানের নানা সংগঠনসহ নানা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। নিদানকালের এ সকল যোদ্ধার প্রতি অযুত শ্রদ্ধা।
লেখক—একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারে সম্মানিত।








