বাংলা ভাষার সংগ্রাম ও বঙ্গবন্ধু
আমাদের ভাষার সংগ্রাম একদিনের কোন ঘটনা ছিলো না। ১৯৫২ সালের আগে পরে কয়েকটি মিছিল বা ২১ ফেব্রুয়ারির ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করাই শুধু ভাষার সংগ্রাম না। তবে ১৯৫২ এর ২১ ফ্রেবুয়ারি ভাষা শহিদ রফিক, শফিউর,সালাম, বরকত,জব্বারের জীবনদান ভাষা আন্দোলনে পূর্ব বাংলার মানুষের চূড়ান্ত ক্ষোভের প্রকাশ ছিলো। এই হত্যাকান্ড মানুষের মুখে নতুন করে প্রতিবাদের ভাষা জুড়ে দিয়েছিল।
যার প্রভাব পরবর্তীতে সাহিত্য,সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে প্রবলভাবে প্রতিফলিত হতে থাকে। যে ক্ষোভকে জ্যোতিষির মতন কাজে লাগিয়ে পূর্ববঙ্গের মানুষকে স্বাধীকারমুখী করতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু। অথচ তিনি ভাষা সংগ্রামের ইতিহাসে কৃত ভূমিকা বা অবদানের তুলনায় খুব কমই উল্লেখিত হয়েছেন। এ নিয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবদ্দশায় কখনো কারো প্রতি অভিযোগ বা অনুযোগ করেননি। বরং বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে ভাষা সংগ্রামের ইতিহাসের সাথে সংশ্লিষ্টদের অবদানকে উদার ও নির্মোহভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
বেঁচে থাকতে বঙ্গবন্ধুকে শৃঙ্খলিত করার চেষ্টা পাকিস্তানি শাসনের শুরু থেকেই ছিলো। পঁচাত্তরের পর পাকিস্তানি ভাবধারার খুনিচক্র মৃত বঙ্গবন্ধুর ওপর সে হামলা অব্যাহত রাখে। তারা মৃত বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাসের পাতা থেকেও তিরোহিত করতে নিরন্তর নির্মম প্রচেষ্টায় নেয়। তারা ইতিহাসে প্রোথিত করার চেষ্টা করেছে ২৭ মার্চে স্বাধীনতা ঘোষণার এক পাঠেই যুদ্ধ শুরু হয়েছিলো। যেমনটি অনেকের কাছে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে যা হয়েছে সেটিই ভাষার লড়াই। ২৭ মার্চ ১৯৭১ এবং ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ এর কোনটিতেই বঙ্গবন্ধু শারীরিকভাবে উপস্থিত ছিলেন না। দু’টি পর্বের দু’টি দিনেই বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর গরাদে বন্দি ছিলেন। এই কারাবাসকে স্বাধীনতা বিরোধীরা বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতি হিসেবে দেখাতে সচেষ্ট। ভাষার আন্দোলনে ভাষা সংগ্রামীরা একেকজন একেক পর্বে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু এ কথা দালিলিক ভাবে নিশ্চিত করে বলা যায়, বঙ্গবন্ধু যিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নানা পর্বে ভাষার লড়াইয়ে যুক্ত ছিলেন। ভাষার সংগ্রামে শরীরী ও অশরীরী দু’ভাবেই প্রবল সংযুক্তি ছিল তাঁর।
আমাদের ভূখণ্ডে ভাষার ওপর আক্রমণ নতুন নয়। পরোক্ষ আক্রমণ শতাব্দীকাল আগেও হয়েছে। যেগুলোর পিছনের কারণ ছিলো বাংলার পৃথক সত্তার সম্ভাবনাকে অংকুরেই বিনষ্ট করা। বহুজাতিক ও বহুভাষিক ভারতবর্ষ যখন ব্রিটিশদের তাড়াতে ঐক্যবদ্ধ, তখন ব্রিটিশ রাজন্যবর্গ ঐক্যবদ্ধ ছিলো ভারত বিভক্তির নকশা প্রণয়ন করে ঠান্ডামাথায় তা কার্যকর করতে। তারা এ জন্য কংগ্রেস ও মুসলিম লীগে তাদের অনুগত ও অনুসারী তৈরি করতে থাকে। একইসঙ্গে ভারতের ভেতরে প্রিন্সলি স্টেটগুলোকেও তারা কাজে লাগাতে থাকে। যে প্রক্রিয়াগুলোর মধ্য দিয়ে অবিভক্ত ভারত অরক্ষণীয় হয়ে ওঠে। শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে এ অঞ্চলকে একটি পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। যেখানে অবিভক্ত থাকার সুযোগ ছিলো।
এ কথা অনস্বীকার্য ১৭৫৭ সালে বাংলা বিহার উড়িষ্যা ইংরেজ করতলগত না হলে বা বহি:শত্রু দ্বারা পরিচালিত না হলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং আবুল হাশিম এ দু’জন নেতা ঐক্যবদ্ধ বাংলার (এৎবধঃবৎ ইবহমধষ) এর পক্ষে ছিলেন। সোহরাওয়ার্দী অবিভক্ত বাংলার শেষ মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তিনি স্বাধীন অখণ্ড বাংলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। যে উদ্যেগে সামিল ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান।
যেহেতু বাঙালি এবং বাংলা- রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজে সমগ্র ভারতে শীর্ষস্থানীয় ছিলো, সঙ্গত কারণে ব্রিটিশ শাসনে বাঙালি নেতৃত্বের বিরুদ্ধ একটি শক্তি বিকাশমান হচ্ছিল।যারা ১৯০৫ সালে বাংলাকে বিভক্ত করে। যদিও আন্দোলনের ফলে সেটি আবার ১৯১১ সালে রহিত হয়। কিন্তু চক্রটি কলকাতা থেকে রাজধানী দিল্লীতে স্থানান্তর করতে সক্ষম হয়। একই চক্রের ষড়যন্ত্রে সুভাষ বসুও কংগ্রেস থেকে ছিটকে পড়েন। ফলে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগে জিন্নাহ ও জওহরলাল নেহেরু প্রবল ও ক্ষিপ্র হয়ে ওঠেন। তারা বিভক্ত ভারত রচনায় নিয়ামমক হন। ধর্মের বিষবাষ্প ছড়িয়ে কিস্তান ও ভারত কায়েম হয়। যার মধ্য দিয়ে বাঙালি ও বাংলা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ফলত ১৯৪৭ সালে বাংলা দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। বাংলার বিভক্তি ঙ্গবন্ধু মানতে পারেননি। বিষয়টি তাঁর লেখা থেকেই পরিস্কার হওয়া যায়-‘কংগ্রেস ভারতবর্ষকে ভাগ করতে রাজি হয়েছে এই জন্য যে, বাংলাদেশ ও পাঞ্জাব ভাগ হবে।
আসামের সিলেট জেলা ছাড়া আর কিছুই পাকিস্তানে আসবেনা। বাংলাদেশের কলকাতা এবং আশপাশের জেলাগুলিও ভারতবর্ষে থাকবে। মওলানা আকরাম খাঁ সাহেব ও মুসলিম লীগ নেতারা বাংলাদেশ ভাগ করার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করলেন। বর্ধমান ডিভিশন আমরা না-ও পেতে পারি। লকাতা কেন পাব না? কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা বাংলাদেশ ভাগ করতে হবে বলে জনমত সৃষ্টি করতে শুরু করল। আমরাও বাংলাদেশ ভাগ হতে দেব না, এর জন্য সভা করতে শুরু করলাম। আমরা কর্মীরা কি জানতাম যে, কেন্দ্রীয় কংগ্রেস ও কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ মেনে নিয়েছে এই ভাগের ফর্মুলা? বাংলাদেশ যে ভাগ হবে, বাংলাদেশের নেতারা তা জানতেন না। সমস্ত বাংলা ও আসাম পাকিস্তানে আসবে এটাই ছিল তাদের ধারণা।’
বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে এও পরিস্কার হওয়া যায় ১৯৪৭ সালেই বাংলাদেশ একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হওয়ার সুযোগ তৈরি য়েছিলো। স্বাধীন বাংলাদেশ কায়েম হলে তারাই ঠিক করতো তারা ভারত না পাকিস্তানের সাথে যাবেন, নাকি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে অবস্থান করবে। মওলানা আকরাম খাঁ সাহেব ঘোষণা করেছিলেন ‘আমার রক্তের উপর দিয়ে বাংলাদেশ ভাগ হবে। আমার জীবন থাকতে বাংলাদেশ ভাগ হতে দেব না। সমস্ত বাংলাদেশই পাকিস্তানে যাবে’।৩ সোহরাওয়ার্দী, আকরাম খাঁ, শরৎ বসু, শেখ মুজিবুর রহমান প্রমূখের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে বিভক্ত বাংলা নিয়ে পাকিস্তান কায়েম হয়। স্বপ্নের শহর কলকাতাও হাতছাড়া হয়ে যায়। সে সময় ষড়যন্ত্রের রাজনীতি হয়ে উঠে মূখ্য।
পাকিস্তান কায়েমের পর নব্য শাসকরা বাংলা ও বাঙালির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকে। যার অংশ হিসেবে বাংলা ভাষার ওপর প্রথমেই আঘাত শুরু করে। বাংলা ভাষার ওপর ষড়যন্ত্র অবশ্য এর আগেও হয়েছে। ১৮৮৬ সালে স্যার সৈয়দ আহমদ খান প্রতিষ্ঠিত সর্ব ভারতীয় শিক্ষা সম্মেলনে বাঙালি ও অবাঙালি প্রতিনিধিদের মধ্যে বাংলার মুসলিম শিক্ষার্থীদের শিক্ষার বাহন বাংলা, উর্দু না ফার্সি এ বির্তক দেখা দেয়। সামাজিক ভিত্তি না পেলেও ১৯২৬ সালে নবাব সলিমুল্যাহর পুত্র খাজা হাবিবুল্ল্যাহর পৃষ্ঠপোষকতায় বাঙালি শিক্ষার্থীদের মাঝে উর্দু প্রসারে ‘অল বেঙ্গল উর্দু এসোসিয়েশন’ তৈরি হয়েছিলো। ১৯৩৭ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নিখিল ভারত মুসলিম লীগের লক্ষ্যে সম্মেলনে দলের কার্য পরিচালনায় দলের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে উর্দুকে গ্রহণের প্রস্তাব করেন। শেরে বাংলা ফজলুল হকের নেতৃত্বে বাংলার শতাধিক কাউন্সিলর তার বিরোধিতা করলে সেটি প্রত্যাহার হয়।৪ পাকিস্তান নামক একটি অসম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পরই পূর্ব বাংলা কার্যত পাকিস্তানের কলোনী হয়ে পড়ে। এ ভূখন্ডের নাগরিকরা হয়ে যায় রাধীন। ফলে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র নিজ নাগরিকদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রহয়ে পড়ে নাগরিকের জীবনে খড়গ। বঙ্গবন্ধুসহ তরুণ জনৈতিকনেতৃবৃন্দ উপলব্ধি করেন পাকিস্তান একটি ভুল রাষ্ট্র।
কমিউনিস্টরা পরিবেশ পরিস্থিতিকে বিবেচনায় না ‘ইয়ে আজাদী ঝুটা হায়, লাখো ইনসান ভূখা হায়’ শ্লোগান তুলে নবপ্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের বিরুদ্ধাচারণ করলে শাসক দল জনমানস বিবেচনায় কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করে। ফলে ১৯৪৭ সালের অব্যবহিত পরপরই পূর্ব বাংলা কার্যত বিরোধী দল শূণ্য হয়ে পড়ে। একইসঙ্গে শাসকচক্র সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমানসহ মুসলিম লীগের লড়াকু শক্তিটিকে দলের মধ্যে কোণঠাসা করে ফেলে। তারা নিজ দলে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হতে থাকেন।
একটি রাষ্ট্রের জন্মের পরেই সে রাষ্ট্রের শেষ পরিণতি বুঝতে পারা কঠিন দূরদর্শিতার বিষয়। যেটি রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে বঙ্গবন্ধু ৪৭’এ ঝেছিলেন। তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরেই কলকাতার সিরাজউদ্দৌলা হোটেলে সমমনা কয়েকজনকে নিয়ে বৈঠক করেন। যেখানে তিনি বলেন ‘আমরা শেষ হয়ে গেছি। নতুন করে সংগ্রাম শুরু করতে হবে।’ ঐ বৈঠকে বঙ্গবন্ধু ছাড়াও শহিদুল্লাহ কায়সার, আখলাকুর রহমান রাজশাহীর আতাউর রহমান প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন।৫ তাঁরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার একমাসের মধ্যেই (৬-৭ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭) গড়ে তোলেন অসাম্প্রদায়িক যুব গঠন ‘গণতান্ত্রিক যুবলীগ’। নতুন শাসকগোষ্ঠি বাংলাকে অবনত রাখার জন্যই বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত করে। প্রথম আঘাতটাই আসে ১৯৪৭ সালে। ২৭ নভেম্বর থেকে ৪ঠা ডিসেম্বর ১৯৪৭ শিক্ষা মন্ত্রী ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের সাধারণ ভাষা হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব গৃহিত হয়। এর প্রতিবাদে খাজা নাজিমুদ্দিনের সরকারি বাসভবনের সামনে ছাত্র শিক্ষক বুদ্ধিজীবীদের প্রতিবাদ মিছিল হয়। যার অগ্রভাগে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন। পরিস্থিতির অনুধাবনে শেখ মুজিবুর রহমান ৪ জানুয়ারি ১৯৪৮ পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে ছাত্রদের সংগঠিত করার সুযোগ তৈরি হয়। ছাত্রলীগ প্রণিত প্রথম পুস্তিকাতেই বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয়। স্বয়ং শেখ মুজিবুর রহমানের সক্রিয় ভূমিকায় সমস্ত জেলায় এক মাসের মধ্যে সংগঠটির শাখা গঠিত হয়। দেশজুড়ে প্রচুর সাড়া পরিলক্ষিত হয়।
৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ করাচিতে পাকিস্তান সংবিধান সভার বৈঠক হয় যেখানে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার বিষয়ে মুসলিম লীগ নেতারা সরব হয়ে ঠে। বিষয়টিতে পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক মহল বেশ নড়েচড়ে ওঠে। ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে কংগ্রেস দলীয় সদস্য বাবু ধীরেন্দ্রনাথ ত্ত বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব করেন। যে প্রস্তাব ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী এবং মুখ্যমন্ত্রী খাজা জিমুদ্দিনসহ শাসকদলের প্রবল বিরোধিতায় বাতিল হয়ে যায়। এর প্রতিবাদে ২৯ ফেব্রুয়ারি পূর্ব বাংলায় ছাত্র ধর্মঘট হয়। এরপর ২ মার্চ তমুদ্দিন মজলিস ও ছাত্রলীগের উদ্যোগে বিভিন্ন হল ছাত্র সংসদের প্রতিনিধি ও অন্যান্যদের নিয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। বাংলা ভাষার ওপর আঘাতকে পুঁজি করে পূর্ব পাকিস্তানে সরকার বিরোধী রাজনীতির শক্ত গোড়াপত্তন হতে শুরু হয়। যার পিছনে তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যক্ষ ভূমিকা লক্ষণীয়। ২ মার্চ ১৯৪৮ ফজলুল হক মুসলিম হলে প্রতিনিধি সভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পূর্ণগঠিত হয়। যে সভায় শেখ মুজিববুর হমান ও নঈমুদ্দিন আহমদ উপস্থিত ছিলেন। ঐসভায় ছাত্রলীগ নেতা শামসুল আলমকে আহবায়ক করা হয়। ১১ মার্চ বাংলা ভাষা দাবী দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। দিবসটি সফল করার জন্য ১০ মার্চ ফজলুল হক হলে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শেখ মুজিবুর রহমান সকদের দেয়া ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে বক্তব্য দেন।
পরদিন ১১ মার্চ পুলিশ শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদসহ অনেককে পিকেটিং করাবস্থায় গ্রেফতার করে। পরে তাঁরা ১৫ মার্চ তারিখ মুক্ত হন। পাকিস্তান রাষ্ট্রে শেখ মুজিবুর রহমানের সেটি ছিলো প্রথম কারাবাস। সেই গণগ্রেফতারের খবর পত্রপত্রিকায় বেড়ুলে সারাদেশে বেশ প্রতিক্রিয়া হয়। মানুষের মধ্যে আন্দোলকারীদের পক্ষে সহানুভূতির সৃষ্টি হতে থাকে। শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির পরদিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখান থেকে একটি স্মারকলিপি আইনসভায় খাজা নাজিমুদ্দিনের নিকট পৌঁছে দেয়া হয়। ক্ষমতাসীন নেতারা ভেবেছিলো উর্দুকে সহজেই রাষ্ট্রভাষা করতে পারবে। তাদের সে আশায় বাঙালিারা বাধ সাধে। জনসমর্থন না পেয়ে তারা ঘাবড়িয়ে গেলেও বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র থেকে রত হয়নি। তারা গর্ভণর জেনারেল জিন্নাহকে উর্দুর পক্ষে শেষ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। জিন্নাহ ঢাকায় এলে তার মুখ দিয়ে উর্দুর পক্ষে বলাতে পারলে বাঙালিরা বিষয়টি মেনে নেবে।
তারা মনে করেছে, জিন্নাহ যেহেতু দল মত নির্বিশেষে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য ও শ্রদ্ধেয় তাই তিনি বললেই কেল্লাফতে। শাসক দলের ভুল ছিল খানেই। জিন্নাহর ঘোষণায় বাঙালি সাড়া দেয়নি। ২১ মার্চ যখন ঘোড়দৌড় মাঠে জিন্নাহ বললেন- ‘একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। তার এ ঘোষণার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হয়েছিল. মানি না মানি না বলে। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৪ মার্চের কনভোকেশনে গিয়ে জিন্নাহ একই কথার দ্বিরুক্তি করে বললেন -পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। সেখানে ছাত্ররা চিৎকার করে বলেছিল না, না, না। এর পরে জিন্নাহ কিস্তানে ফিরে গেলে সাময়িক ভাবে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা নিয়ে কৌশলগত নীরবতা কিছুদিন দেখা যায়। পাকিস্তানিরা যখন নীরব,তখন পূর্ব পাকিস্তানে পৃথকভাবে রাজনৈতিক সংগঠন বিনির্মাণে সচেষ্ট হন মুসলিম লীগের একটি প্রগতিশীল অংশ, যাঁদেরকে পাকিস্তানিরা আমলে নেয়নি এবং রাজনৈতিক স্থান না দিয়ে পাকিস্তান বিরোধী হিসেবে আখ্যা দিতে থাকে। যাঁদের মধ্যে ছিলেন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, মওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ,আতাউর রহমান খান, আব্দুস সালাম, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদসহ অনেকে।
১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতা থেকে স্থায়ীভাবে চলে আসেন। তিনি ডেরা পাতেন ১৫০ মোগলটুলি পার্টি হাউসে। সেখান থেকেই নিত্যদিন নানা কর্মসূচি নিয়ে এগুতে থাকেন। বউ সংসার, মা বাবা দেশের চেয়ে তাঁকে বেশি টানেনি। দেশের টানে তিনি ঢাকায় অবস্থান নিয়ে পুরোদস্তুর হোলটাইমার পলিটিশিয়ান হয়ে পড়েন। রাজনীতির বাইরে কোন কিছুই তাঁর মাথায় ছিলোনা। পিতার পরামর্শে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে ভর্তি হন বটে। সেখানে যতটা না পড়া তার চেয়ে বেশি ছিল তাঁর অনচারের বিরুদ্ধে লড়াই করা। তিনি ছাত্রলীগের কর্মীবাহিনীসহ সংযুক্ত য়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বছরব্যাপি আন্দোলনে।
যে আন্দোলন ১৯৪৮ সালের মার্চ থেকে শুরু হয়ে ১৯৪৯ সালের প্রথমার্ধ অব্দি চলে। শাসকগোষ্ঠী শেখ মুজিবের নানাবিধ কাজগুলোকে গভীরভাবে লো করতে থাকে। তাঁকে বিরত করার নানামুখী ষড়যন্ত্রও করতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ২৯ মার্চ ১৯৪৮ শেখ মুজিবুর রহমানসহ ২৭ জন ক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়। ১৫ টাকা জরিমানা ও মুচলেকা দেয়ার শর্ত পালনে অপরাগতা দেখালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শেখ মুজিবুর হমানকে বহিষ্কার করে। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়া হয়। ১৯৪৯ সালের এপ্রিলে বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেয়া হলে ছাত্রদের শাস্তি বাতিল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের দাবীদাওয়ার পক্ষে ১৮ এপ্রিল উপচার্যের বাসভবনে ছাত্ররা অবস্থান নিলে পরদিন সেখান থেকে ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর হমান গ্রেফতার হন। মুক্তি পান ২৬ জুন। তাঁর মুক্তির মাত্র তিনদিন পূর্বে পাকিস্তানের রাজনৈতিক জীবনে মোড় ঘুরিয়ে আওয়ামী মুসলীম লীগ নামে একটি রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ করে। যার সভাপতি হন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক হন টাঙ্গাইলের শামসুল হক। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ অমিত সম্ভাবনাময়ী তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে কারারুদ্ধ অবস্থায় সেই নবগঠিত দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক র্বাচিত করেন। কমিটি নির্বাচনকালে তাঁর মত নেয়া হয়েছিলো। একজন ছাত্রনেতা সরাসরি রাজনৈতিক দলের ৩য় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে কমিটিতে স্থান পান। যা তাঁর গুরুত্ব ও রাজনৈতিক সক্ষমতার বহিপ্রকাশ ছিলো।
লিয়াকত আলী খান ১৯৪৯ সালের পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচনায় মনোযোগ দেন। তিনি বলেন- ইসলামী আদর্শের ওপর পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র চিত হবে। এ নিয়ে সংখ্যালঘু ও অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসীদের ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। একই সময়ে আবারো বাংলা ভাষা সংস্কারের নামে তাতে আরবি রফ বসানোর উদ্যোগ নেয় সরকার। শেখ মুজিবুর রহমান সে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেন। শেখ মুজিবুর রহমান খাদ্য সংকট কাবেলায় সরকারি ব্যর্থতার বিরুদ্ধেও সেসময় স্বোচ্ছার হন। ফলে তাঁকে আটক রেখে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে ক্রিয়াশীল হয় সরকার। সরকার ১৯৪৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর তাঁকে জনরিাপত্তা আইনে গ্রেফতার করে। তিনি বন্দি হয়ে পড়েন লম্বা সময়ের জন্য। তাঁর অনুপস্থিতিতে ১৯৫০ সালের ৭ মার্চ গণপরিষদে ত্থাপিত রিপোর্টে আবারো উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলা হয়। এতে বাঙালিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম হয়। আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে ১৯৫০ সালের ৪-৫ নভেম্বর গ্রান্ড ন্যাশনাল কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয় সেখানে পূর্ববঙ্গ থেকে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার এবং ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের আলোকে পূর্ব বাংলার পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্বশাসনের দেবার দাবি তোলা হয়। স্বায়ত্বশাসনের দাবি তোলার মধ্য দিয়ে বাংলার তন্ত্রকে প্রথম ইঙ্গিত করা হয়।
ভাষা আন্দোলনকে জোরদার করার জন্য ১৯৫১ সালে ভাষা মতিনকে আহবায়ক করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন হয়। ১৯৫২ সালের ২৫-২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন ঢাকায় ঘোষণা করেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। এরপর ৩১ জানুয়ারি ঢাকা আইনজীবী সমিতিতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, তমুদ্দিন মজলিশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদসহ ৬২টি রাজনৈতিক সামজিক সংগঠনের সমন্বয়ে একটি সর্বদলীয় রাষ্ট্রকেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ গঠিত হয়। যার আহবায়ক হন কাজী গোলাম মাহাবুব। কারা অভ্যন্তরিণ শেখ মুজিব তখন চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেলে। তিনি সেখানেই ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতৃবৃন্দের সাথে গোপনে বৈঠক করেন। সকলকে ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালনের নির্দেশ দেন এবং নিজে জেলখানায় অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন শুরু করবেন জানিয়ে দেন। তদবিষয়ে অসমাপ্ত আত্মজীবনী শেখ মুজিবুর রহমান পৃষ্ঠা- ১৯৬-১৯৭ থেকে বঙ্গবন্ধুর লেখা উদ্ধৃত করা হলো- ‘আমি হাসপাতালে আছি। সন্ধ্যায় মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ।
আমি ওদের রাত একটার পরে দেখা করতে বললাম।আরও বললাম, খালেক নেওয়াজ, কাজী গোলাম মাহবুব আরও কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকে খবর দিতে। দরজার বাইরে আইবিরা পাহারা দিত। রাত অনেকে ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন পিছনের বারান্দায় ওরা পাঁচ-সাতজন এসেছে।আমি অনেক তে একা একা হাঁটাচলা করতাম। পুলিশরা চুপচাপ পড়ে থাকে, কারণ জানে আমি ভাগব না। বারান্দায় বসে আলাপ হল এবং আমি বললাম সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে।’ উল্লেখিত বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হাসপাতালে বন্দি অবস্থাতেই শেখ মুজিবুর রহমান শত প্রতিকুলতা মোকাবেলা রে নেতা কর্মীদের ভাষা সংগ্রামে করণীয় নিয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। হাসপাতালে থেকে বন্দি শেখ মুজিবুবের রাজনীতির বিষয়টি গোয়েন্দা চোখ ফাঁকি দিতে পারেনি ফলশ্রতিতে তাঁকে দ্রুত জেলাখানায় ফিরিয়ে নিয়ে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তরিত করা হয়।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বার, বরকত,সালাহউদ্দিন শহিদ হন, আহত হন অনেকেই। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নামে হয়রানীমূলক মিথ্যা মামলা ও গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী হয়। মওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ, খয়রাত হোসেন, আব্দুর রশিদ, খান সাহেব ওসমান আলী, আবুল হাশিম, কাজী গোলাম মাহাবুব, খালেক নেওয়াজ, আব্দুল মতিন,অলি আহাদ প্রমুখ দেশরক্ষা আইনে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দি হয়ে যান। বন্দি বঙ্গবন্ধু নেতাদের দেয়া কথা অনুয়ায়ী টানা দশদিন অনশন করেন, তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে সরকার ২৬মাস পর ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ তাাঁকে মুক্তি প্রদান করে। বঙ্গবন্ধু জেল থেকে মুক্তি পেয়ে আবার আন্দোলন গড়ে তোলায় নিজেকে বিপুল বেগে যুক্ত করেন। এই সময়কালে ২৬ এপ্রিল ১৯৫২ বামপন্থিরা ছাত্র ইউনিয়ন নামক একটি প্রগতিশীল ছাত্র
সংগঠনের জন্ম দেয়।
শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে বাংলা ভাষার প্রশ্নে হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দীকে নিয়ে একটা ধোয়াঁশা সৃষ্টি হয়েছিলে। বঙ্গবন্ধু সেটিকে রিস্কার করেন। শাসকদল যাতে সোহরাওয়ার্দীকে নিয়ে নোংরামো করতে না পারে সেজন্য তিনি ১৯৫২ সালের ২১ মে করাচিতে সোহরাওয়ার্দীর সাথে দেখা করেন। তাঁর কাছ থেকে বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার লিখিত বিবৃতি আদায় করেন। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন সভা সমাবেশে সোহরাওয়ার্দী বাংলাকে উর্দুর পাশাপাশি রাষ্ট্রভাষা করার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানের দাবিকে সমর্থন করে বক্তব্যও প্রদান করেন। যা বিপুল নসমর্থন আদায়ে সক্ষম হয়। এর পরে ৩০ মে করাচিতে ও জুনের মাঝামাঝি লাহোরে শেখ মুজিবুর রহমানের পৃথক পৃথক সাংবাদ সম্মেলনে বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করেন।
শেখ মুজিবুর রহমান ৭ এপ্রিল রংপুরের জনসভায় উর্দুকে পঞ্চম শ্রেনি পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করার বিরুদ্ধে তিনি বক্তব্য দেন। ২৭ এপ্রিল রাষ্ট্রভাষা গ্রাম পরিষদের প্রতিনিধি সভায় এবং ২৯ এপ্রিল বিবৃতি দিয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করেন। ২৮ আগস্ট ১৯৫৩ তিনি বিবিৃতি দিয়ে বলেন- রকার প্রদেশের বিদ্যালয়গুলোতে উর্দুকে বাধ্যতামূলকভাবে চালু করার চক্রান্ত হইতে বিরত না হলে পূর্ব পাকিস্তানে উর্দুকে বর্জন করা হবে। ভাষা আন্দোলনকে ধরে সমগ্র পূর্ববঙ্গ্ েদেশের রাজনৈতিক বিকল্প গড়ায় তিনি মনোনিবেশ করেন। তিনি নবপ্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগকে প্রতিষ্ঠায় যেমন ছুটেছেন তেমনি আন্দোলন-সংগঠন-আন্দোলন পদ্ধতিতে এগুতে থাকেন। ৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপি পালন হয়। জেলায় জেলায় শহিদ মিনার, নগ্নপায়ে প্রভাতফেরি প্রভৃতি কাজ বাঙালি জাতিসত্তাকে বিকশিত করায় বেশ কাজে দেয়। স্বয়ং মওলানা ভাসানী,আব্দুর রশিদ তর্কবাগিশসহ বঙ্গবন্ধুর নগ্নপদে প্রভাতফেরির সেদিনের বিখ্যাত ছবি সে কথাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।
পাকিস্তানিদের অপশাসন, বায়ান্নর রক্তদান ও ভাষার দাবিকে কে পুঁজি করে শেখ মুজিবুর রহমান পরিকল্পিতভাবে এগুতে থাকেন। পরিকল্পিত
ভাবে সংগঠন গড়ে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ঝড় তোলেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে শুধুনিজেই জিতেননি সমগ্র দেশে মুসলিম লীগের কবরও রচনা করেন। যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার প্রথমটিই ছিলেঅ বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করার। ১৬, ১৭ ও ১৮ নং দফাও ভাষা আন্দোলন সংক্রান্ত। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তিনি এক ঝানু পলিটিশিয়ান হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করেন। জনগণ তাঁকে গ্রহণ করলেও পাকিস্তান সরকার যুক্তফ্রন্ট সরকারকে মেনে নিতে পারেনি। তারা ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের ৯২/ক ধারা বলে ফজলুল হক এর সরকারকে মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় বাতিল করে পূর্ব বাংলায় কেন্দ্রীয় শাসন জারি করে। তারা পরিকল্পিতভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রী হিসেবে পথের দিনেই আদমজীতে দাঙ্গা বাধিয়ে মানুষ হত্যা করে কেন্দ্রের শাসন জারির ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রী হিসেবে শপথের দুই সপ্তাহের মধ্যেই মন্ত্রিসভা বাতিল হয় এবং তিনি সেদিনই গ্রেফতার হন।
পাকিস্তানিরা ভাষার ওপর আক্রমণ করেই ক্ষান্ত হয়নি তারা পূর্ব বাংলার নামও পরিবর্তন করে। ১৯৫৫ সালের ২৫ আগস্ট গণপরিষদের অধিবশনে পূর্ব বাংলার নাম পরিবর্তনের বিরুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমান প্রবল আপত্তি তোলেন। ২১ সেপ্টেম্বরের আলোচনায় পুনরায় পূর্ব পাকিস্তানের ত্বশাসনের বিষয়ে আলোচনা করেন। ১৯৫৬ সালের ২১ ফ্রেব্রুয়াারি গণপরিষদে বাংলায় বক্তব্য প্রদানের জন্য স্পিকার সি ই গিবনের নিকট তিনি জোর দাবি জানান । শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৬ ও ১৯৫৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত অধিবেশনে ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ৫ মিনিট সংসদ অধিবেশন মূলতবী করার প্রস্তাব করেন এবং তা গৃহিত হয়। যার মধ্য দিয়ে সংসদ আনুষ্ঠানিকভাবে ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রর্দশণ করে। ৫৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি গণরিষদে প্রতিরক্ষা বাহিনীতে বাংলায় ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করার দাবি করেন তিনি। অনেক লড়াই সংগ্রামের পর অবশেষে পাকিস্তান সরকার ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রে উর্দুর সাথে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। এই জয়, বাংলা ও বাঙালি সত্তাকে আরো আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে গঠিত প্র্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রী হন শেখ মুজিবুর রহমান। সেই সরকার ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস, ভাষা শহিদদের পরিবারকে আর্থিক সাহায্য দান, শহিদ মিনার নির্মাণে অর্থ সাহায্য করে। শুধু তাই নয় বাঙালি সংস্কৃতিকে ধারণ করে ১লা বৈশাখকে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের পদক্ষেপগুলো তখন গৃহিত হয়।
একুশে ফেব্রুয়ারি ও ১লা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের দিন হিসেবে বিকশিত হতে থাকে। মাহবুব উল আলম চৌধুরীর একুশের প্রথম কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ আব্দুল গাফফার চৌধুরী লিখিত শহিদ আলতাফ মাহমুদের সুরে গীত অমর সৃষ্টি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফ্রেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’ সমগ্র জাতিসত্তাকে নাড়া দেয়। ভাষার সংগ্রাম চলার মাঝেই ষাটের দশকে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করে পাকিস্তানিরা। তারা বাধা হয়ে দাঁড়ায় রবীন্দ্র চর্চায়। এর বিরুদ্ধেও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাজনীতি ও সংস্কৃতির অঙ্গনে লড়াই হয়। রবীন্দ্র ন্মশতবার্ষিকীকে ধরে সংস্কৃতির লড়াই গ্রামগঞ্জেও ছড়িয়ে পড়ে। এই লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দলগুলোর মধ্যে একটা মেলবন্ধন তৈরি হয়। সে সময়ে রাজনীতি ও সংস্কৃতি হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে- বিচ্ছিন্নতা ঘটেনি। আইয়ুবের সামরিক শাসনসহ বাংলা ও বাঙালির ণসংগ্রামে সংস্কৃতি কর্মীরাও শেখ মুজিবুর রহমানকে আস্থায় নিয়ে এগুতে থাকেন। ক্রমান্বয়ে শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে ওঠেন শিল্পী সংগ্রামীদেরও নেতা। ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলন পরবর্তীতে ’৬৬ সালে বাঙালির মুক্তির ৬ দফা ঘোষণা করলে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন অবিসংবাদিত নেতা। শাসকগোষ্ঠী মরিয়া হয়ে ওঠে শেখ মুজিবকে রুখতে। মামলায় মামলায় জর্জরিত করে তোলায় হয় তাঁকে। সর্বশেষ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়ে তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানোর অপচেষ্টা করে। কোন কিছুই তাঁকে রুখতে পারেনি। শত অত্যাচারেও শেখ মুজিবুর রহমান ন্যুয়ে পড়েননি। তিনি দৃঢ়তার সাথে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এগিয়ে নিয়েছেন।
১৯৭০ এর নির্বাচনি ম্যান্ডেট তাঁকে সর্বব্যাপি করে তোলে। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে আগ্রহী না হয়ে বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীন বাংলাদেশের বাস্তবায়নে বিভোর হন। রাষ্ট্র ক্ষমতা গ্রহণের পর রাষ্ট্রের ও আদালতের ভাষা কি হবে সে নিয়েও তিনি কথা বলেছেন। আদালত পাড়ার দূর্ভেদ্য ভাষা নিয়েও বলেছেন। বিচারে যাতে বাংলা ভাষার ব্যবহার হয় সে কথা তিনি ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ বইমেলার অনুষ্ঠানে বলেছিলেন ‘ আমি ঘোষণা করছি, আমাদের হাতে যেদিন ক্ষমতা আসবে, সেদিন থেকেই দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হবে। বাংলা ভাষার পন্ডিতেরা পরিভাষা তৈরি করবেন, তারপর বাংলা ভাষা চালু হবে- সে হবে না।
এই আলোচনা থেকে পরিষ্কার, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু বলতে তিনি বাংলাদেশ ভূখণ্ড এবং তার ভাষাকেই বুঝিয়েছেন। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাস্তবায়ন। তিনি কথা রেখেছিলেন- ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ মুক্ত স্বদেশে ফিরেই বাংলায় দাপ্তরিক কাজ শুরু করেছিলেন। শুধু তাই নয় ৪ নভেম্বর ১৯৭২ গৃহিত সংবিধান বাংলায় প্রণিত হয়। যেখানে প্রজাতন্ত্রের ভাষা হিসেবে বাংলাকে গ্রহণ করা হয়েছে। শুধু তাই নয় সংবিধানের ১৫৩ অনুচ্ছেদের ৩ উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাংলা ও ইংরেজি পাঠের ক্ষেত্রে বাংলা প্রাধান্য পাবে। এখানেই শেষ ছিল না জাতিসংঘে প্রদত্ত তাঁর বাংলায় ভাষণ, বাংলা ভাষা ও নবীণ রাষ্ট্রের মর্যাদাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়েছিলো। আপন মহিমায় স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রাণ ভোমরা হয়ে ওঠা বঙ্গবন্ধু ছিলেন ভাষা সংগ্রামেরও এক অদম্য আলোকবর্তিকা। অথচ তাঁকে এড়িয়ে বহুবার চেষ্টা হয়েছে ইতিহাস বিণিমার্ণের। সেসব কাজে দেয়নি, দেবেও না।








