গণহত্যার বিরুদ্ধে আমেরিকান বিবেকের বিদ্রোহী উচ্চারণ
ভূখণ্ড পৃথক হলেও আমেরিকার সাথে বাংলাদেশের মানুষের পরাধীন ও উপনেবেশিক জীবন একই শাসকের অধীন ছিলো। আমেরিকা ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশদের ঝেটিয়ে বিদায় করে। আমেরিকা স্বাধীন হবার মাত্র ১৯ বছর আগে, ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমাদের উপমহাদেশ দখলের যাত্রা শুরু করে। অর্থাৎ ব্রিটিশদের শাসন যখন আমরিকায় শেষ তখন আমরা ব্রিটিশদের শেকলে বন্দী হতে শুরু করি। ব্রিটিশ বিরোধী মুক্তির সংগ্রাম ছিলো প্রলম্বিত। আমাদের বেদনা ব্রিটিশদের বিদায়ের সাথে সাথে শেষ হতেই পারতো কিন্ত হয়নি। যারফলে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ আরও ২৩ বছর বাড়তি শোষনে আমাদের নিগৃহিত হতে হয়েছে।
পাকিস্তানি শাসনে আমাদের মতামতের মূল্য ছিলো না। না চাকুরিতে আমাদের জায়গা ছিল, না বাণিজ্যে। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার নামে আমরা কার্য়ত পাকিস্তানের নতুন উপনিবেশ বা কলোনী হয়ে পড়ি। শিকার হই চরম জুলম ও শোষনের। শের-ই বাংলা, মওলানা ভাসানী, হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু, মণি সিংহ, মোজাফ্ফর আহমদ প্রমুখের নেতৃত্বে আমাদের পূর্বপুরুষেরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়েছে। বিষেশত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে একত্রিত জাতি ষাটের দশকজুড়ে সামরিক শাসন বিরোধী লড়াই ও ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়। বিজয়ী হলেও রাষ্ট্রের দায়িত্ব পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন আমাদের জনপ্রতিনিধিরা।
পাকিস্তান সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর না করে গণনিধনের পরিকল্পনা করে। ভিন্নমতকে দমন করতে সশস্ত্র আঘাত করে। ২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতেই ঢাকা শহরসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক গণহত্যা করে। ২৬ মার্চ গ্রেফতার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে আবারো স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এতে পাকিস্তানিরা আরো ক্ষিপ্ত হয়। তারা ব্যাপক গণহত্যায় সামিল হয়। গণহত্যায় নিরিহ নাগরিক ও হিন্দু ও সংখ্যালঘুদের টার্গেট করাসহ বাড়িঘর লুটতাড়াজ,অগ্নিসংযোগ করে পাকিস্তানিরা। যে গণহত্যায় তৎকালিন আমেরিকান দূতাবাসের কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড ব্যাথিত হয়ে পড়েন। কনসাল জেনারেল অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা একাত্তরে ঢাকা শহরের গণহত্যার চাক্ষুস সাক্ষীও বটে। এই বেদনা শুধু মন:কষ্টে সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং ব্লাডের নিজ দেশের নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কারণ হয়। আর্চার কে ব্লাড ঢাকা থেকে টেলিগ্রামে নিক্সন প্রশাসনকে লিখেছেন — “Here in Dacca we are mute and horrified witnesses to a reign of terror by the Pak military.”
সেখানে আরো বর্ণিত হয়েছে, “non-Bengali Muslims are systematically attacking poor people's quarters and murdering Bengalis and Hindus.”
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তদানিন্তন প্রেসিডেন্ট নিক্সন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার বিপরীতে অবস্থান নেন। গণহত্যা মার্কিন নীতিতে সমর্থন যুক্ত না হলেও পাকিস্তানের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক থাকায় সে নীতি উপেক্ষিত হয়। যার ফলে মার্কিন সরকার পাকিস্তানি গণহত্যায় নীরব থাকে। যা প্রকারন্তে পাকিস্তান আর্মির গণহত্যার পক্ষেই যায়। আমেরিকার সরকারের এ ধরণের নীতির বিরুদ্ধে স্বোচ্চার হন আর্চার কে ব্লাড। তিনি এবং ২০ জন সহকর্মী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে পাকিস্তানিদের গণহত্যার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন। তাঁরা আমেরিকার পাকিস্তানকে সমর্থন করার প্রচলিত রাষ্ট্রীয় নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। শুধু তাই নয়, তারা আমেরিকার নিক্সন প্রশাসনকে তাদের নীতি বদলের আহবান জানান। যা ছিল একজন সরকারি কর্মচারী হিসেবে স্পষ্টত বিদ্রোহ। আমেরিকার বিরুদ্ধে আমেরিকান একজন সরকারি চাকুরের বিরুদ্ধাচারণ। তিনিসহ ২০ জন আমেরিকান দূতাবাস কর্মচারী সরকারকে একটি টেলিগ্রাম প্রেরণ করেন। যা ইতিহাসে ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ হিসেবে পরিচিতি পায়। আর্চার কে ব্লাড (Archer Kent Blood) এটি পারিবারিক নাম। নামের শেষাংশ Blood শব্দটি বাংলায় বোঝায় রক্ত। আমাদের শৈশবে এমনি একটি সরল ধারণা ছিল জনাব আর্চার রক্তাক্ষরে টেলিগ্রামটি পাঠিয়েছিলেন বলে টেলিগ্রামটির নাম ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’। ধারণাটি একদমই সঠিক নয়। সঠিক না হলেও হলেও জনাব আর্চার কে ব্লাডের টেলিগ্রামের মধ্য দিয়ে তাঁর হৃদয়ের রক্তক্ষরণের বিষয়টি ফুটে উঠেছিল।
১৯৭১ সালে মার্কিন সরকার বাংলাদেশের সমস্যাকে বুঝতে পারেনি বা বুঝতে চেষ্টা করেনি। সরকার বুঝতে না পারলেও মার্কিন জনগণ কিন্তু ঠিকই বুঝেছিলো। যে কারণে সরকারের বিপরীতে গিয়ে আমেরিকার জনগণ বাংলাদেশের জনগণ ও তাঁদের স্বাধীনতার আকাঙ্খার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে ছিলেন। এগিয়ে এসেছিলেন কেনেডির মতন দাপুটে সিনেটেরসহ অনেকেই।
আর্চার কে ব্লাডের কৃতিত্ব এখানে, তিনি প্রথম অফিসিয়ালি বাংলাদেশের পক্ষালম্বন করেন। গণহত্যার বিরুদ্ধে স্বোচ্ছার হন। যেটি দালিলিক সাক্ষ্য হিসেবে দুনিয়া ব্যপি গুরুত্ব পায়। সরকারের নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে একটি কনসুলেটের অধিকাংশ সদস্যই যখন অবস্থান নেন তা নি:সন্দেহে মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার মতন কাজ। যে কাজের জন্য মেধাবি কূটনীতিক আর্চার কে ব্লাডকে খেসারত দিতে হয়েছে। তিনি আর কখনোই সরকারি চাকুরিতে কাঙ্খিত প্রমোশন পাননি। একপ্রকার ডেক্স অফিসিয়াল হিসেবে পেশাগত জীবনের ইতি টানতে হয়েছিলো। মার্কিন সরকারের অবহেলার শিকার হন। বাংলাদেশের পক্ষ নিয়ে মার্কিন নীতি বদলের আহবান জানানোর কারণে তাঁকে ঢাকা থেকে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছিলো।
১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে। ত্রিশ লক্ষ মানুষের জীবনদানের মধ্য দিয়ে স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় মার্কিন বিরোধিতার পরও।
বিজয়ের পর মার্কিন সরকার বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের বাস্তবতা স্বীকার করে। তারা সে বাস্তব উপলব্ধি থেকে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সাথে দ্রুত কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। ৪ এপ্রিল ১৯৭২ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। মার্কিন প্রশাসনের বাংলাদেশকে স্বীকৃতি ও ঘনিষ্ঠতা আর্চার কে ব্লাডের বাংলাদেশ নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন বললে অত্যুক্তি হবে না।
আজ ২০২৫ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছর। এই পঞ্চান্ন বছরে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে হলেও বাংলাদেশ এগিয়েছে। বাংলাদেশ তাঁর নিজের গুরুত্ব তৈরি করতে পেরেছে। যার কারণে আমেরিকানরাও বাংলাদেশ নিয়ে আগ্রহী। আমেরিকার সবলতার দিক বৈরি রাষ্ট্রকে নিজের প্রয়োজনে আবার আপনও করে নিতে পারে। পুরোনো ক্ষত ভুলিয়ে নতুন সম্পর্ক তৈরিতে দারুণ দক্ষতা তাদের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পারোমানবিক বোমায় নাস্তানাবুদ জাপানকে ঠিকই বন্ধু করতে সক্ষম হয়েছে। জাপান-মার্কিন বর্তমান সম্পর্ক দেখলে যে কারুরেই মনে হতে পারে আমেরিকা কখনোই জাপানে বোমা ফেলেনি, হিরোশিমা –নাগাসাকির ক্ষত আমেরিকার তৈরি নয়।
আমেরিকা রাষ্ট্রের শক্তির দিক গৃহিত রাষ্ট্রিয় নীতিতে কোন ভুল ত্রুটি থাকলে তা শুধরে এগিয়ে যাওয়ার। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি অন্যয্য হলে সেখানেও রিভিউ করা। ক্ষতিগ্রস্থকে সম্মানিত করা। যা আমাদের দেশে ভাবাই যায়না। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ভিন্নমত বা অতীতের প্রতিপক্ষকে পুনর্মূল্যায়নের প্রবণতা ভীষন দুর্বল। আমাদের কেউ একবার শত্রু মানে চিরকাল শত্রু। যা আমাদের পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণও বটে।
দেখুন, মার্কিন সরকার ১৯৭১ সালে ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ এর কারণে আর্চার কে ব্লাডকে প্রত্যাহার করেছিলো। ৬ এপ্রিল ১৯৭১ ব্লাড ও তার ২০ সহকর্মী যে টেলিগ্রামটি পাঠায়, তা ছিল মূলতই দ্বিমতের (dissent)” তথা প্রতিবাদ। যাতে লেখা ছিল: “Our government has failed to denounce atrocities. Our government has failed to take forceful measures … bending over backwards to placate West Pak-dominated government … Our government has evidenced what many will consider moral bankruptcy.”
যে দূতাবাস উপরোক্ত টেলিগ্রামের কারণে তাঁকে প্রত্যাহার করেছিলো, সেই দূতাবাসেই মার্কিন সরকার তাঁর নামে (তাঁর মৃত্যুর পর ২০০৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর) ‘আর্চার কে ব্লাড আমেরিকান সেন্টার লাইব্রেরী‘ নামে একটি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেছে। এটি একটি স্বীকৃতি এবং একইসাথে মার্কিন উপলব্ধিও বটে। নিজের ভুল সিদ্ধান্তের রিভিউ করা দোষের নয়। পরাজয় নয় বরং উন্নত মানসিকতার প্রকাশ, সভ্যতার প্রকাশ।
এছাড়াও আর্চার কে ব্লাড ১৯৭১ সালের সাহসী কূটনৈতিক পদক্ষেপ ও ভিন্নমতের জন্য পেয়েছিলেন- Christian A. Herter Award — “extraordinary accomplishment involving initiative, integrity, intellectual courage and creative dissent”। আবার ২০০৫ সালে Bangladeshi-American Foundation, Inc. (BAFI)-এর প্রথম কনভেনশনে তাঁকে “Outstanding Services Award”–এ ভূষিত করা হয়।
আর্চার কেন্ট ব্লাড ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৪ মৃত্যু বরণ করেন। তাঁর শেষকৃত্যু হয় ফোর্ট কলিন্স, কলোরাডোতে। এরপর তিনি ভার্জিনিয়ার আর্লিংটন ন্যাশনাল সিমেট্রিতে সমাহিত হন। এখানে রাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা মানুষকে শুধু সমাহিত করা হয়। এই সিমেট্রিতে আর্চার কেন্ট ব্লাড কে সমাহিতকরণ আমেরিকা রাষ্ট্রের তাঁর কৃতকর্মের প্রতি ইতিবাচক স্বীকৃতির বর্হিপ্রকাশ।
১৯৭১ এর যুদ্ধে অবদান রাখা অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক ওডারল্যান্ড (যাঁকে বীর প্রতীক খেতাব দেয়া হয়), আমেরিকার সিনেটর কেনেডি যাদেরকে বাংলাদেশের সুহৃদ মনে করি। তাঁদের কৃত লড়াইগুলোর জন্য তাঁরা আজ আমাদের ইতিহাসের আপনজন। এরকম আরো অনেকেই গত শেখ হাসিনা সরকারের সময় সম্মানিত হয়েছেন। কিছুটা হলেও তাঁরা আর্চার কে ব্লাডকেও সম্মানিত করেছেন। যে সম্মানই জানানো হোক সেটি আর্চার কেন্ট ব্লাডের অবদানের তুলনায় যথেষ্ট নয়। আমার চোখে আর্চার কে ব্লাড পেশাগত জীবনে একজন শহিদ। আমাদের স্বাধীনতার জন্য এবং ১৯৭১ এ পাকিস্তানি গণহত্যার বিরুদ্ধে বলার জন্যই-তিনি চিরদিনের জন্য নিজের ক্যারিয়ারের আত্মাহুতি দিয়েছেন। মেধা ও যোগ্যতা থাকার পরও রাষ্ট্রদূত হতে পারেননি।
চাকুরিতে তাঁর উন্নতি হয়নি। তাঁর এ বলিদান আমেরিকার মহান জনগণের মর্য়াদাকে মহিয়ান করেছে। ব্লাড ভয়কে উপেক্ষা করে নিয়োগ কর্তা নিক্সন-কিসিঞ্জার সরকারকে দেখিয়েছেন তাদেরও ভুল আছে। সাহসের সাথে বলেছেন আমেরিকার স্বার্থের জন্য সে ভুল বা নীতির বদল দরকার। অনেকটা মার্টিন লুথার কিং এঁর ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে বলা সেই অমর উক্তির মতন- ``I oppose the war in Vietnam because I love America . I speak out against it not in anger but with anxiety and sorrow in my heart…” যার বাংলা ভাবার্থ দাঁড়ায়- আমি ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধী কারণ, আমি আমেরিকাকে ভালোবাসি। আমি একথা রাগে বলছি না, বরং উদ্বেগ ও বিষন্নতার সঙ্গে বলছি”।
আমাদের রক্তক্ষরণ, আনন্দ-বেদনার সকলক্ষণে আর্চার কেন্ট ব্লাডকে অশেষ শ্রদ্ধা।








