Thursday 03 September, 2026

দেশে ব্যান্ডউইথ সংকটে ইন্টারনেটের দাম বাড়া ও গতি কমার আশঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: 11:56, 2 September 2026

দেশে ব্যান্ডউইথ সংকটে ইন্টারনেটের দাম বাড়া ও গতি কমার আশঙ্কা

দেশে ব্যান্ডউইথ সংকটে ইন্টারনেটের দাম বাড়া ও গতি কমার আশঙ্কা

নতুন সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগের বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতা দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশ শিগগিরই মারাত্মক ব্যান্ডউইথ ঘাটতিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাদের আশঙ্কা, সময়মতো পদক্ষেপ না নেওয়া হলে আগামী বছরগুলোতে দেশের ইন্টারনেট সেবার দাম বাড়তে পারে এবং গতিও কমে যেতে পারে।

গত সোমবার ঢাকার অদূরে এক রিসোর্টে টেলিকম ও টেকনোলজি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত এক কর্মশালায় এসব তথ্য উঠে আসে।

কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ বছরে দেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ২৬০ গুণ। ২০১৩ সালে যেখানে ব্যবহার ছিল মাত্র ৫০ জিবিপিএস, ২০২৬ সালে তা পৌঁছেছে প্রায় সাড়ে ১৩ টেরাবিটে।

এই প্রবণতা থামার লক্ষণ নেই। পূর্বাভাস বলছে, ২০২৭ সালে চাহিদা দাঁড়াবে প্রায় ১৯ টেরাবিটে, ২০২৮ সালে প্রায় ২৭ টেরাবিটে, ২০৩০ সালে ৫৪ টেরাবিটে এবং ২০৩৫-৩৬ সালের মধ্যে তা কয়েকশ টেরাবিট ছাড়িয়ে যেতে পারে। ভিডিও স্ট্রিমিং, ক্লাউড, এআই, অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল পেমেন্টসহ সার্বিক ডিজিটালাইজেশনই এই বাড়তি চাহিদার মূল কারণ।

বর্তমানে দেশের আন্তর্জাতিক সংযোগ মূলত নির্ভরশীল দুটি সরকারি সাবমেরিন ক্যাবলের ওপর—যাদের মিলিত সক্ষমতা প্রায় সাড়ে ৭ টেরাবিট। বাকি চাহিদা মেটানো হয় ভারতের মধ্য দিয়ে স্থলপথের ক্যাবল আমদানি করে। তুলনায় ভারত ১৯টি, মালয়েশিয়া ২৩টি, থাইল্যান্ড ১২টি এবং ফিলিপাইন ১৯টি আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত—ফলে যেকোনো একটি ক্যাবলে বিভ্রাট হলে বাংলাদেশ বড় ঝুঁকিতে পড়ে যায়।

তৃতীয় একটি সরকারি ক্যাবল চালু হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে যথেষ্ট হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা, বিশেষত পুরোনো একটি ক্যাবলের কার্যকাল ২০৩০ সালেই ফুরিয়ে যাওয়ার কথা। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যেই ঘাটতি প্রায় ২০ টেরাবিটে গিয়ে ঠেকতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসরকারি খাতে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের অনুমতি দ্রুত দেওয়া হলে বাড়তি প্রায় ৫১ টেরাবিট সক্ষমতা যুক্ত হতে পারে, যা বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াবে এবং ভারত-নির্ভরতা কমাবে। একটি বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল প্রতিষ্ঠানের একজন শীর্ষ নির্বাহী কর্মশালায় বলেন, নতুন সংযোগ এলে ইন্টারনেটের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে, সেবার মান বাড়তে পারে ২৫-৩০ শতাংশ এবং লেটেন্সি কমবে।

কিন্তু এর উল্টো দিকও রয়েছে—বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, নতুন বিনিয়োগ সময়মতো না এলে একই ঘাটতির চাপে উল্টো ইন্টারনেটের দাম বাড়তে পারে এবং সারাদেশে সংযোগের গতি ও মান কমে যেতে পারে, কারণ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ক্রমেই পিছিয়ে পড়বে।

একটি নতুন সাবমেরিন ক্যাবল পরিকল্পনা থেকে চালু হতে কয়েক বছর সময় লাগে বলে জানান বক্তারা। তাই সংকট চোখে পড়ার পর উদ্যোগ নিলে সমাধানের জন্য পর্যাপ্ত সময় নাও থাকতে পারে। তাদের আশঙ্কা, সিদ্ধান্তহীনতা চলতে থাকলে অতীতে একটি বড় আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবল কনসোর্টিয়ামে যুক্ত হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করার মতো আরেকটি কৌশলগত ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।

বক্তারা আরও বলেন, বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবলের প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য কোনো ক্যাবল কোম্পানি নয়, বরং ভারতের মধ্য দিয়ে আসা স্থলপথের ব্যান্ডউইথ আমদানি—আর এই বৈচিত্র্য আনাটাই দেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য জরুরি।