Saturday 06 June, 2026

এস.এম.আব্রাহাম লিংকন 

বাংলাদেশের জন্মে সাহিত্যের ভূমিকা  

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: 16:37, 19 February 2026

বাংলাদেশের জন্মে সাহিত্যের ভূমিকা  

বাংলাদেশের জন্মে সাহিত্যের ভূমিকা  

অবিভক্ত ভারতের মুক্তির জন্য অগ্রগামী ছিল বাঙালিরা। লড়াই সংগ্রামে ছিল সর্বগ্রাসী। ক্ষুদিরাম থেকে সূর্য়সেন, বাঘা যতীন থেকে মনি সিংহ। লীলা নাগ থেকে প্রীতিলতা। শেরে-ই-বাংলা, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সকলেই বাংলার সন্তান। যাঁরা একটা অখণ্ড বাংলাদেশ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে ভেবেছেন ও লড়েছেন।

আবার রবীন্দ্রনাথ থেকে দ্বিজেন্দ্রলাল। নজরুল থেকে জীবননান্দ, সুকান্ত থেকে শরৎচন্দ্র সকলেই জন্মভমি বাংলাকে নিয়ে ভেবেছেন ও লিখেছেন। রাজনীতি ও সংস্কৃতি যখন সমমতে চলতে পারে তখন নিশ্চিতভাবে নতুন কিছুর জন্ম হয়। উপরোক্ত যে সকল লেখকদের নাম উচ্চারণ করা হলো তাঁদের মৃত্যুর অনেক পরে ‘বাংলাদেশ’ নামক স্বতন্ত্র জন্মভূমি প্রতিষ্ঠা পায়। যে জন্মের পিছনে ত্রিশ লক্ষ শহিদ,কয়েক লক্ষ নারীর সম্ভ্রম বিসর্জনসহ পাহাড়ে সমতলে বিপুল জনগোষ্ঠির জীবনদান ও করুণ কান্না লুকিয়ে আছে।
 
উল্লেখিত কবি সাহিত্যিকদের অনেকের মৃত্যুর অনেক, অনেক বছর পরে বাংলাদেশের জন্ম। এই দেশের জন্ম অনেক পরে হলেও ‘বাংলাদেশ’ নামক একটা ভূখন্ডকে তাঁরা সবসময়ই কল্পনা করেছেন। শুধু তাই নয়,সেই বাংলাদেশ যেন যূথবদ্ধ থাকে সে নিয়েও তাঁরা ভেবেছেন। তাঁরা বাংলা ও বাংলাদেশ নিয়ে সৃষ্টি করেছেন অনবদ্য সাহিত্য। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান বিরোধী লড়াইয়ে তাঁদের সৃজিত পঙতিগুলো কামানের গোলার মতন তেজস্বী ও সূঁচের মতন সোজা ছিল। যে পঙতিগুলো একাত্তরের যুদ্ধে শত্রুর গোলার মুখেও একজন মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রের মতন পবিত্রতায় উচ্চারণ করেছেন। 
আজকে ‘জয় বাংলা’কে কেউ কেউ দলীয় শ্লোগান বলে অভিযোগ করেন,এড়িয়ে যান। শুনলে ক্ষিপ্ত হন। বিশেষত একাত্তরে যারা এ শ্লোগানে উজ্জীবিত যৌবনের কাছে পরাজিত ছিলেন তারা ও তাদের অনুসারীদের মধ্যে এরুপ রোগ-বালাই শক্তপোক্তভাবে দৃশ্যমান। অথচ একাত্তরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রধানতম শ্লোগানই হয়েছিল ‘জয় বাংলা’। যে শ্লোগান উচ্চারণ করতে করতে একজন মুক্তিযোদ্ধা শত্রুর গোলায় জীবন উৎসর্গ করেছেন। ‘জয় বাংলা’ কথাটি নিশ্চিতভাবে রাজনৈতিক হলেও এটি সাহিত্য থেকেই নেয়া। শ্লোগানটির জনক হচ্ছেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। এটি তাঁর ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’ কবিতার থেকে নেয়া শব্দ। 

এ কথা নতুন করে বলার নয় যে,ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামের শারীরিক লড়াই শেষ হয়ে যায় ১৯৪৭ এর মধ্য আগস্টে। তবে তাদের প্রোথিত বিভাজনের বিষ এখনো আমরা বয়েই চলেছি। ক্রমান্বয়ে আমরা ভারতীয় থেকে পাকিস্তানি, বিশেষত প্রদেশগুলোতে বাঙালি,পাঞ্জাবি,সিন্ধু,বেলুচ নানা জাতিগত উপাধিতে প্রবল হতে থাকি। এখন অবশ্য সেসবও উবে গেছে। এখনকার বড় পরিচয় হচ্ছে-কে মুসলিম, কে হিন্দু, কে জৈন কেবা বৌদ্ধ আর খ্রিস্টান!! 

বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ মুক্ত স্বদেশের মাটিতে পা দিয়ে নিজের আত্ম পরিচয়ে বলেছিলেন- আমি মানুষ, আমি বাঙালি, আমি মুসলমান। সেই ধারা এখন বদলে গেছে। এখন সেখানে প্রথম স্থান দখল করেছে ধর্মীয় পরিচয়। পিছিয়ে গেছে জাতিগত পরিচয়। শেষধাপে গিয়ে ঠেকেছে মানুষ কিনা সেটি।  অথচ সেই কবে বিদ্রোহী কবি লিখেছিলেন-“হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?” “কান্ডারি বল, ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মার”

মুক্তিযুদ্ধের পূর্বকালে (বিশেষত ১৯৪৭ পূর্ব এবং ১৯৪৭–১৯৭১ পর্যন্ত সময়কালে) বাঙালি কবি-সাহিত্যিকদের অনেকেই পূর্ব বাংলার নিপীড়িত জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সাহিত্য রচনা করেন। তাঁদের স্বপ্নে ও কল্পনায় ছিল বাংলাদেশ। লিখেছেনও বাংলাদেশকে নিয়ে। সেই লেখাগুলোই কালক্রমে হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নবীজ। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ তদানিন্তনরা ছিলেন ভারতীয় মুক্তির দিশারী। সর্বভারতীয় ঐক্য তাঁদের চাওয়া ছিল। সর্বভারতীয় বোধ থাকলেও রবীন্দ্রনাথ সহ বাঙালি লেখকরা ‘ঐক্যবদ্ধ বাংলার’ চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ‘বাংলার’ ভিতরেই বিশ্বকে দেখার চেষ্টা করেছেন। ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা। তোমাতেই বিশ্ব মায়ের আঁচল পাতা’, সে চেষ্টারই প্রতিফলন। বিশ্বকবির কবিতার এ চরণ দু’টি গীত হয়েছে লক্ষ কোটি বার। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে গীত গানগুলোর অন্যতমও ছিল এটি। আমাদের জাতীয় সঙ্গীত তো- বাংলার রুপ, রস, বেদনা বিরহ ও মায়ের প্রতি ভালোবাসার অনবদ্য প্রকাশ। বাংলাদেশের জন্মেরও ছয় দশক আগের লেখা এটি। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের বেদনায় লেখায় এ গান।

যেখানে বাংলাকে একটা অখণ্ডিতরুপে চিন্তা করা হয়েছে। তিনি এও লিখেছেন– 

‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি
তুমি এই অপরুপ রুপে বাহির হলে জননী
ওগো মা তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে!’
আবার তিনি ‘পুণ্য হউক’ কবিতায় বলেছেন- 
‘বাংলার মাটি, বাংলার জল,
বাংলার বায়ু, বাংলার ফল,
পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, হে ভগবান।’ ------
‘বাংলার হিন্দু, বাংলার মুসলমান,
বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিস্টান,
বাংলার হৃদয় হউক মহান।
পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, হে ভগবান।’
কিংবা- ‘একি অপরুপ রুপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী জননী’ 
আমরা বাংলা সাহিত্যে জীবনানন্দ দাশের ‘রুপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থকে বিশ্লেষন করলে দেখতে পাই সেখানে বাংলাকে নিয়ে কবির আকূল উপস্থাপনা। তাঁর বিখ্যাত কবিতা- 
‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ 
খুঁজিতে যাই না আর—’

কিংবা কবির ‘আবার অসিব ফিরে’ কবিতাটি নিয়ে আলোচনা করলে তথায় দেখতে পাই বাংলাদেশ নিয়ে কবির আগ্রহ আর ভালোবাসার প্রবল প্রকাশ। সমগ্র কবিতাটিই বাংলার প্রকৃতির বিবরণে সমৃদ্ধ। সেখানে রুপান্তরের মধ্যে হলেও বাংলাদেশে কবির ফিরে আসার দৃঢ় ইচ্ছের প্রকাশ রয়েছে। 

‘আবার আসিব ফিরে
ধানসিঁড়িটির তীরে — এই বাংলায়,
হয়তো মানুষ নয় — হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে;
হয়তো ভোরের কাক হয়ে — এই কার্তিকের নবান্নের দেশে 
কুয়াসার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল ছায়ায়।’ 

বাংলাকে নিয়ে কবির কি ব্যকুল প্রকাশ। জীবনানন্দ দাশ, কাজী নজরুল, রবীন্দ্রনাথ একাত্তরে জন্ম নেয়া বাংলাদেশের জন্মের অনেক অনেক আগে বাংলাদেশ নামক একটি স্বতন্ত্র ভূখণ্ডের স্বপ্ন ধারণ করেছিলেন। যেখানে ধর্ম বর্ণ জাতি গোষ্ঠি নির্বিশেষে একটি যূথবদ্ধ বাংলাদেশকে তাঁরা কল্পনা করেছেন। জীবনানন্দ দাশতো বলেইছেন, যদি মানুষ হিসেবে আসতে নাও পারেন, হয়তো হাঁস হয়ে আসবেন। কিংবা আসবেন শঙ্খচিল শালিকের বেশে।  শিকলবন্দী পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলনের পর বাঙালির জীবনে রবীন্দ্রনাথ,কাজী নজরুল ইসলাম, সূকান্ত ভট্টাচার্য় ,জীবনানন্দ দাশ, দ্বিজেন্দ্রলাল, অতৃল প্রসাদ, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখ প্রবলভাবে চর্চিত হতে থাকেন। তাঁরা সংস্কৃতির উঠোনে ও রাজনৈতিক মঞ্চে অপরিহার্য় হয়ে পড়েন। 

দ্বিজেন্দলালের 
‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা,  
তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা,  
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, 
ও সে সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি’।  

পঞ্চাশ থেকে সত্তর দশক তাঁদের সৃষ্ট সাহিত্য বাংলা ও বাঙালির মুক্তির সুত্ররেখা হয়ে ওঠে। যার কারণে পাকিস্তানিরা রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়। ষাটের দশকে জন্ম শতবার্ষিকীতে রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমেরিকা নিউইয়র্কের টাইমস্কোয়ারকে একদিনের জন্য ‘টাগোর স্কোয়ার’ হিসেবে ঘোষনা করেছিল। সেই সময়কালে ফিল্ড মার্শাল আইউব খান রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করেন। শুধু তাই নয় সে সময় ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়ার কারণে বরেণ্য শিল্পী জাহিদুর রহিমকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুকুরে চুবানো হয় মর্মে অভিযোগ রয়েছে। এত বাধার পরও পঞ্চাশ ও ষাটের দশকজুড়ে রবীন্দ্রনাথ সূর্য়ের মতন আমাদের আলো দিতে থাকেন। 

সূকান্ত ও নজরুলের সাহিত্যে বাংলার অভাব, দারিদ্র, প্রকৃতি ও নিপিড়িত মানুষ ছিল মূল বিষয়। বাঙালির এ দু’জন মহান কবির লেখা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে প্রবলভাবে আমাদের তারুণ্যকে উজ্জীবিত করেছে। তাঁদের পঙিতিগুলো ছিল আমাদের তারুণ্যের উচ্চারণে। সূকান্তের ছাড়পত্র,রানার, একটি মোরগের কাহিনী, দেয়াশলাই কিংবা নজরুলের-বাংলাদেশ, বিদ্রোহী, মানুষ, কারার ঐ লৌহ কপাট, চল চল চল, নারী, সাম্যবাদী,কুলির অভিসাপ’ কান্ডারী হুশিয়ার, দুর্দিনের যাত্রী, প্রভৃতি কবিতা তারুণ্যর হৃদয়ে আগুন ধরিয়ে দিত। 

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কবি শামসুর রাহমানের কবিতাও হয়ে ওঠে উদ্ধৃতিযোগ্য। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে ২০ জানুয়ারির শহিদ আসাদুজ্জামানকে নিয়ে লেখা ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটি ক্ষোভের আগুণে ঘৃত ঢালার মতন জ্বালানীর কাজ দেয়। তিনি ছিলেন আত্মনিয়ন্ত্রণ ও জাতীয়তাবোধের কণ্ঠস্বর। স্বাধীনতা নিয়ে তাঁর অনেকগুলো কবিতা এখনো আমাদের অস্তিত্বকে নাড়া দিয়েই যাচ্ছে। যেগুলোর মধ্যে-স্বাধীনতা তুমি,তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা, তোমার পায়ের নিচে জমিন খুঁড়ি, বর্ণমালা আমার দুখিনী বর্ণমালা উল্লেখযোগ্য। কবি আল মাহমুদের সোনালী কাবিনসহ অনেক লেখাই আমাদের ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে সৃজিত। 

পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির হালচাল নিয়ে ১৯৭০ সালে নির্মলেন্দু গুণের লিখিত ‘হুলিয়া’ কবিতাও অমর সৃষ্টি। পচাত্তরের পরে বঙ্গবন্ধু নিষিদ্ধ হয়ে পড়লে তিনি লেখেন ‘স্বাধীনতা শব্দটি কি ভাবে আমাদের হল ‘। যেখানে তিনি বঙ্গবন্ধুর নাম একবারের জন্যও নেননি। অথচ সমগ্র কবিতাটিই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। কবিতায় তিনি বঙ্গবন্ধুকেই স্বাধীনতার প্রধান কবি হিসেবে চিত্রিত করেছেন।
 
আমরা গদ্য সাহিত্যেও সেই সময়গুলোর সাহিত্যিকদের লেখায় বাংলাদেশকে খুঁজে পাই। গদ্য সাহিত্যে-দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পন’,গ্রাম বাংলায় প্রচলিত নবাব সিরজ উদ দৌল্লাকে নিয়ে নানা নাটক,যাত্রা, শহিদুল্লাহ কায়সারের ‘সংশপ্তক’ (১৯৬৯) জহির রায়হানের- বরফগলা নদী, ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাঁর ছোট গল্প, সত্যেন সেন রচনাবলী, মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’,আহমদ ছফা, শওকত আলী, শওকত ওসমান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস,আবু জাফর শামসুদ্দিনের লেখা। সৈয়দ শামসুল হক প্রণিত বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সমালোচিত ‘খেলারাম খেলে যা’ উপন্যাসেও রাজনীতি এসেছে। এসেছে শেখ মুজিবের কথা। মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে তাঁর উপন্যাস  ‘নীল দংশন’ ও নিষিদ্ধ লোবান, নাটক পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ, নূরলদীনের সাড়া জীবন এগুলো স্বাধীনতা পরবর্তীকালের সৃষ্টি হলেও তা মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের বিভিন্ন জনপদের মানুষের নানা সংগ্রামকে তুলে ধরেছে। আমার পরিচয় নামে ক্ষুদ্র কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিসত্বার বিবরণ অনবদ্যভাবে তুলে ধরেছেন। সেলিনা হোসেনের- ‘উৎপল নদীর বন্দর’ জলময় দিন, যাপনের ভাষা, নটনন্দিনী, ভগ্নকাল, হাঙর নদী গ্রেনেড,  ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’  প্রভৃতি গ্রন্থগুলোতে দেশভাগ ও মুক্তিযুদ্ধের প্রবল ছায়া রয়েছে। 

মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব সাহিত্য সংস্কৃতির জাগরণে যেমন রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা ছিল তেমনি সংস্কৃতি কর্মীদের রাজনেতিক সচেতনার বিকাশে অবদানও সীমাহীন। এ প্রসঙ্গে জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া’’র অবদান স্মরণযোগ্য। 

ষাটের দশকে সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চায় সত্যেন সেনের নেতৃত্বে উদীচী, সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে মহিলা পরিষদ, সনজিদা খাতুনের নেতৃত্বে ছায়ানট, ছাত্র সংগঠনের মধ্যে ছাত্র ইউনিয়ন ব্যাপক অবদান রাখে। একসময় সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার জন্য অনেকেই ছাত্র সংগঠনটিকে হারমোনিয়াম পার্টি নাম দেয়। অবশ্য ব্যাপক না হলেও ছাত্রলীগের ভমিকাও ছিল উল্লেখযোগ্য। উভয় ছাত্র সংগঠনই একদল প্রগতিশীল সাহিত্যিক ও সংস্কৃতি কর্মীর জন্ম দিয়েছিল। এ ধারা আশির দশক অব্দি ছিল প্রবহমান ছিল। নন্দিত লেখক ও নাট্যকার হুমায়ুন আহমেদের জোস্না ও জননীর গল্প, তদীয় ভ্রাতা জাফর ইকবালের আমার বন্ধু রাশেদ, আশির দশকের কবি মোহন রায়হান, লেখক আনিসুল হক মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশকে নিয়েই লিখে চলেছেন এখনো। আনিসুল হকের ‘মা’ এবং ‘কখনো আমার মাকে, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। 

ছোট্ট কলেবরের এ লেখায় অনেক লেখকের কথা তুলে ধরা সম্ভব হলো না। সেজন্য অতৃপ্তি রয়েই গেল। লেখাটি রবীন্দ্রনাথকে দিয়েই শেষ করতে চাই। ২০১১ সালে কবির সার্ধশত জন্মবার্ষিকীতে লিখিত একটি কবিতার ক’টি চরণ উদ্ধৃত করে সমাপিত টানি-

‘একজন মুক্তিযোদ্ধা 
যুদ্ধে পা হারিয়েছেন শত্রুর গোলায়, অস্ত্র খুইয়েছেন প্রবল জলস্রোতে 
তবুও রবীন্দ্রনাথ 
ছিটকে পড়েন নি তাঁর কষ্ঠ থেকে।
‘একজন ক্লিনশেভড্ পাকিস্তানি জেনারেল 
’৭১ এ শুশ্রুমণ্ডিত রবীন্দ্রনাথকে ভয় করতেন, কামানের গোলার মতন। 
অথচ রবীন্দ্রনাথ তিরোহিত ছিলেন দশক তিনেক।’ 
(সুত্র:‘শেষ যুদ্ধের ডাক দিয়ে যাই’ । পূর্বা প্রকাশনী, ২০১১ সাল)  

পাকিস্তানিরা রবীন্দ্রনাথ,নজরুলকে চিনতে পেরেছিল। যে কারণে মৃত্যুর পরও রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল পাকিস্তানিদের শত্রু ছিলেন। পশ্চিমারা সম্যক জ্ঞাত ছিল, আমাদের সাহিত্য,সংস্কৃতি এবং কবি, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানের জন্য হুমকি। তাঁরা গোলার চেয়েও ভয়াভয়। তাঁদের প্রোথিত চেতনা দেহান্তরের বিনাশ হয় না বরং বুদবুদ করে! বাঙালি মানসে আগুন জ্বালায়। তাই ১৯৭১ এ নিশ্চিত পরাজয়ের লগ্নেও পাকিস্তানিরা ভুলেনি আমাদের বাতিঘরগুলো নিভিয়ে দিতে। ১৪ ডিসেম্বরে বুদ্ধিজীবী নিধনকাণ্ড সে লক্ষেরই প্রতিফলন। 

 

এস.এম.আব্রাহাম লিংকন