হুমায়ূন আহমেদ এর ছোট গল্প “যন্ত্র”- পাঠ প্রতিক্রিয়া
হুমায়ূন আহমেদের লেখা ছোটগল্প “যন্ত্র” আমাকে বেশ নাড়া দিয়েছে, এটি তার সায়েন্স ফিকশন ঘরানার একটি ছোটো গল্প। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি যেমন আবিস্কারের বহু আগেই উড়ন্ত যান্ত্রিক পাখি, হেলিকপ্টার, ট্যাঙ্ক এবং বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রের নকশা তৈরি করেছিলেন; জুলভার্ন যেমন উড়োজাহাজ, রকেট কিংবা সাবমেরিনের বাস্তব ও ব্যবহারিক প্রয়োগের অনেক আগেই মহাকাশ ভ্রমণ ও সমুদ্র তলদেশে ভ্রমণের কল্পকাহিনী লিখেছিলেন, ঠিক তেমনি করেই হুমায়ূন আহমেদ ‘যন্ত্র’ গল্পে এক অনাগত সময়ের অতি উন্নত বিশ্বে জরা ও মৃত্যুকে জয় করা অমর মানুষের সুখ দুঃখ,আনন্দের অনুভূতি ও যন্ত্র নিয়ন্ত্রিত জীবনের গল্প শুনিয়েছেন। সেই গল্প শুনে শিউরে উঠতে হয়, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষ অত্যন্ত উন্নত এক সমাজে বাস করেও আর সুখী বা তৃপ্ত নয়, তাকে যন্ত্র কিনে এক কৃত্রিম আনন্দ খুঁজে নিতে হয়।
‘যন্ত্র’ গল্পে হুমায়ূন আহমেদ এমন এক সময়ের ছবি এঁকেছেন যখন ডেথ হরমোন আবিস্কার করে এবং সেই হরমোন শরীর থেকে বের করে দেয়ার পদ্ধতি উদ্ভাবন করে মানুষ অমরত্ব লাভ করেছে। মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া হলো এই পৃথিবীতে এক আনন্দময় অবিনশ্বর জীবন, অমরত্ব পাওয়ার জন্য প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ নানারকম চেষ্টা করেছে। তার গল্পের মানুষেরা জরাকে জয় করেছে, বার্ধক্যজনিত কারণে তার আর মৃত্যু হবেনা, জীবাণু এবং ভাইরাস ঘটিত কোনো অসুখ ও পৃথিবীতে নেই ! অমরত্ব তাদের হাতের মুঠোয় , কিন্তু তাদের জীবনে আনন্দ কি আর আছে? সেই পৃথিবীতে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভাবনীয় উন্নতির ফলে প্রাণীর জিনের সাথে উদ্ভিদের জিন মিলিয়ে অদ্ভুত সব জিনিস তৈরী হচ্ছে, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়াররা সেই পৃথিবীর সবচাইতে সম্মানিত মানুষ, বলা যায় দেবতা। কারণ তাঁরা এই পৃথিবীকে ক্ষুধামুক্ত করেছেন। সমুদ্রের শৈবালকে স্বাদু স্টার্চে পরিণত করে, উদ্ভিদের সাথে জীবের জিনের সংযোগে তৈরী করছেন সুস্বাদু প্রোটিনসর্বস্ব উদ্ভিদ। ক্ষুধা ও জরা ব্যাধি মুক্ত প্রায় স্বর্গসম জীবনের অধিকারী হয়েও সেই পৃথিবীর মানুষেরা সুখী নয়, তাদের নিজস্ব জীবন যাপন থেকে তারা আর আনন্দ অনুভব করেননা। অমরত্বের কারণে পৃথিবীর জনসংখ্যা বেড়ে চলেছে, তাই সে সমাজে সবাই সন্তান জন্মাবার অধিকার পান না , পরিকল্পিত ভাবে পৃথিবীর জনসংখ্যা কমিয়ে আনার জন্য রয়েছে সন্তান জন্মানোর অনুমতিহীন অজস্র দম্পতি। মানুষ কমে এসেছে, কিন্ত পৃথিবী ভরে উঠেছে যান্ত্রিক রোবটে।
‘যন্ত্র’ গল্পের মানুষটিও তেমনি এক নিঃসঙ্গ অসুখী মানুষ, যিনি সন্তান জন্মাবার অধিকার পাননি, তার সাতানব্বই তলার অত্যাধুনিক বিলাসবহুল এপার্টমেন্টে আনন্দের নানা উপকরণ ছড়ানো। ত্রিমাত্রিক ছবি দেখার জন্য রয়েছে হলোরামা, রয়েছে মস্তিষ্কের আনন্দকেন্দ্র উত্তেজিত করে আনন্দ পাবার নানা রকম ব্যবস্থা। তারপরেও তিনি সুখী নন, কোনো কিছুতেই আর আনন্দ খুঁজে পান না। তাই অবশেষে একদিন তার পঞ্চাশ বছরের অর্জিত অর্থের সবটাই খরচ করে তিনি কিনে নিয়ে আসেন সেই শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার পি থার্টি টু নামের এক বিশেষ যন্ত্র। পি থার্টি টু যন্ত্রটি বেশ কিছু শ্বাপদ জন্তুর মস্তিষ্কের স্মৃতি ধরে রেখেছে। এই স্মৃতি বায়োকারেন্টের মাধ্যমে মানুষের মাথায় সঞ্চারিত করা হয়।
গল্পের মানুষটি এই যন্ত্র মাথায় সেট করে চালু করে এক ভিন্ন জগতে চলে যান! সেখানে তিনি অনুভব করেন তিনি এখন আর কোন সাজানো গোছানো এপার্টমেন্টে বাস করেন না, তিনি বাস করেন গহীন এক বনে। তিনি অনুভব করেন তিনি এক বাঘিনী, তার রয়েছে তিনটি শিশু শাবক, যাদেরকে গত দুদিন ধরে তিনি পুরুষ বাঘের হাত থেকে আগলে রেখেছেন। বাঘিনী আজ প্রবল তৃষ্ণায় পানির সন্ধানে বের হয়েছে, আকাশে বিরাট চাঁদ, তার আলোয় ঝলমল করছে বনভূমি। মাটির ঘ্রান, ফুলের ঘ্রান, চারপাশের গাছপালার শেকড় ও পাতার ঘ্রান ছাড়াও বাঘিনী হয়ে তিনি টের পাচ্ছেন খুব কাছেই থাকা পানির ঘ্রান। তার তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে, কিন্ত রক্তের ভিতর অনুভব করছেন প্রবল আনন্দ। তিনি জলের সন্ধানে এগুচ্ছেন, কিন্ত তাঁর সমস্ত ইন্দ্রিয় তার শাবকদের দিকে। এরকম একটি জীবন্ত বর্ণনার মাধ্যমেই হুমায়ূন আহমেদ পি থার্টি টু নামক যন্ত্রের মধ্য দিয়ে অমর মানুষদের কৃত্রিম উপায়ে পশুদের জীবন যাপনে তাদের আনন্দ খুঁজে পাওয়ার কথা বলেছেন। হুমায়ূন আহমেদ ‘যন্ত্র’ গল্পের ইতি টেনেছেন এভাবে:
‘’অমর মানুষরা এখন দিনরাত ঘরেই বসে থাকে। তাদের কাজ করার প্রয়োজন নেই। কাজের জন্যে আছে রোবট শ্রেণী। চিন্তা-ভাবনারও কিছু নেই। অমরত্বের বেশি আর কিছু তো মানুষের চাইবারও নেই। এখনকার মানুষ দিনের পর দিন একই জায়গায় একই ভঙ্গিতে বসে থাকে। পি থার্টি টু যন্ত্র লাগিয়ে পশুদের জীবনের অংশবিশেষ যাপন করতে তাঁদের বড় ভালো লাগে। এই তাঁদের একমাত্র আনন্দ।”
কি ভয়ঙ্কর না? মানুষ হয়ে মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাপনে মানুষের আর আনন্দ নেই, বরং যান্ত্রিক ভাবে পশুদের জীবন যাপনে কৃত্রিম আনন্দ খুঁজে পাওয়া, এটা কি মানুষের প্রগতি ও অগ্রগতির মাপকাঠি হতে পারে? কখনোই না!
পৃথিবীটা এখন যন্ত্রময়, আমাদের জীবনযাত্রার প্রায় পুরো অংশ জুড়ে রয়েছে প্রযুক্তি ও যন্ত্রের ব্যবহার। আধুনিক সভ্যতার অভাবনীয় সব আবিস্কার, ডিভাইস বা যন্ত্রের অকল্পনীয় উদ্ভাবন এখন আমাদের জীবনযাপন,চিন্তা চেতনা ও অনুভূতিকে অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণ করছে। সম্প্রতি উদ্ভাবিত যন্ত্র ও প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স কি আমাদের সৃষ্টিশীলতা ও সংবেদনশীলতাকে ই ‘যন্ত্র’ গল্পের মতোই নিয়ন্ত্রণ করবে? খুব ভয় হয়, হুমায়ুন আহমেদের লেখা এই সায়েন্স ফিকশন একদিন না জানি সত্যি হয়ে যায়? নাকি আমরা ইতিমধ্যেই সেই জীবনে প্রবেশ করেছি? কঠিন বাস্তবকে এড়িয়ে আমরা অনলাইনে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা অন্যদের জীবন যাপন করতে চাই, হতে চাই তাদের মতো। নিজ জীবনের সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে উঠতে চাই অন্যের জীবনকে যাপন করে, আর সেটা করতে গিয়ে আমাদের নিজেদের আয়ত্তে যে প্রাপ্তি ও আনন্দ আছে সেটা কে আর অনুভব করা হয়না। আসুন ডিভাইসকে নিয়ন্ত্রিত ভাবে ব্যবহার করি, আমরা যেন যন্ত্র বা ডিভাইস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হই, প্রগতির দৌড়ে মানুষ থেকে যেন যন্ত্রে পরিণত না হই।
নচিকেতার গানের ভাষায় বলতে হয়:
ধ্বংসের ব্যবসায় মগ্ন যে সভ্যতা তার অমৃত চাই না
বিভেদমন্ত্রে দীক্ষিত যে সভ্যতা তার অমৃত চাই না
সবুজ পৃথিবীটাকে যন্ত্রের কালো হাতে
শ্বাসরোধ করে যে প্রগতি
পরিসংখ্যানে মাপে জীবনের ক্ষয়ক্ষতি
এমন প্রগতি চাই না।








