বিস্ময়ের ঘোর কাটেনা কিছুতেই
হুমায়ূন আহমেদের নিশিকাব্য গল্পের নাম দেখে যা ভেবেছিলাম- একদম তা হয়নি। আর যা হয়েছে তাও ছিলো অসম্ভাবী এবং চিরন্তন। আসুন দেখা যাক কী রয়েছে এই গল্পে ?
আনিস একটি কোম্পানির চাকুরী সূত্রে শহরে থাকেন। গ্রামে তাঁর বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন, স্ত্রী এবং শিশুকন্যা। কাজের চাপে তাঁর বাড়িতে আসা হয় খুব কম। একদিন সহসা বাড়িতে আসার সুযোগ মেলে তাঁর। চাকুরির কারণেই তাঁকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হচ্ছে। পথেই বাড়ি। এই সুযোগ সে হাতছাড়া করতে চায়নি। রাতটা বাড়িতে কাটিয়ে তিনি ভোরের ট্রেনে সেই কর্মস্থলে যেতে পারবেন। তাঁর এতো ব্যস্ততা যে গত ঈদেও তিনি বাড়ি আসতে পারেননি। আজ সন্ধ্যা পেড়িয়ে বেশ অনেকটা রাতে বাড়ি এসে পৌঁছালেন আনিস। এখানেই শুরু হলো নিশিকাব্য গল্পের শুরু। আনিসকে নিয়ে হৈ চৈ পড়ে গেলো সকলের মাঝে। শীতের সময়। সুতরাং পিঠা তাকে খাওয়াতে হবে। মা বোনেরা লেগে গেলেন পিঠা বানাতে। ভালো ভালো রান্নার প্রস্তুতি চলছে। ছোটবোন রুনুর বিয়ে নিয়ে কথা হচ্ছে। পাশের বাড়ির ছোট চাচা আনিসের খবর পেয়ে এসেছেন।
বিয়েসহ পারিবারিক বেশ কয়েকটা ঝামেলা মেটাতে হলো। খাবারের পরে গভীর রাতেও গোল হয়ে চলছে গল্প। তারপর শুতে শুতে অনেক দেরী। ছোট্ট মেয়ে টুকুন তখনও ঘুমাচ্ছে। আনিসের স্ত্রী পরী ভেবে পাচ্ছে না কী করবে ! গতবারের আনা শাড়িটা কি পরবে ? তারপর টুকটাক স্বামী-স্ত্রীর কথোপকথন। এরই মধ্েয টুকুন উঠে পড়েছে। বাইরে দু’একটা কাক ডেকে উঠেছে। এর মধ্েযই বাবার ডাক- এখন রওনা না দিলে ট্রেন ধরতে পারবি না। সান্নিধ্য আর কি পাওয়া হলো আনিস আর পরীর !
পাঠকের জন্য গল্পের শেষ প্যারাটুকু তুলে দিলাম- “আনিস বাইরে বেরিয়ে দেখল চাঁদ হেলে পড়েছে। জ্যোৎস্না ফিকে হয়ে এসেছে। বিদায়ের আয়োজন শুরু হলো। ঘুমন্ত ঝুনুকে আবার ঘুম থেকে টেনে তোলা হলো। সে হঠাৎ বলে ফেলল- ভাবী আজ বিয়ের শাড়ি পরেছে কেন ?
কেউ তার কথার জবাব দিল না। মানুষের সুখ-দুঃখের সাথি আকাশের চাঁদ। পরীকে অহেতুক লজ্জা থেকে বাঁচানোর জন্যই হয়তো একখণ্ড বিশাল মেঘের আড়ালে তার সকল জ্যোৎস্না লুকিয়ে ফেলল।
লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে চলল আনিস। শেষ রাতের ট্রেনটা যেন কিছুতেই মিস না হয়।”
বাংলা সাহিত্যে আমার পড়া অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প নিশিকাব্য। গল্পটি প্রিয় পদরেখা বইতে হুমায়ূন আহমেদের অন্যান্য গল্প- রূপা, একটি নীল বোতাম, কল্যাণীয়াসু, দ্বিতীয় জন, চোখ, একদন ক্রীতদাস, অচিন বৃক্ষ প্রভৃতি গল্পের সাথে স্থান পেয়েছে।
হুমায়ূন আহমেদকে আমরা সবাই ঔপন্যাসিক হিসেবে আখ্যা দেই। কিন্তু তাঁর রয়েছে এরকম বিশাল গল্পের ভাণ্ডার। গল্পগুণে তিনি শীর্ষতম গল্পকার। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রয়েছে তাঁর অসংখ্য গল্প। তার মধ্যে উনিশ শ’ একাত্তর, নন্দিনী, জলিল সাহেবের পিটিশন, শীত, জনক, অসুখ, পাপ, শ্যামল ছায়া এবং পঙ্গু হামিদ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
জলিল সাহেবের পিটিশন গল্পে আমরা জানতে পারি বৃদ্ধ জলিল সাহেব বত্রিশ হাজার সিগনেচার নিয়ে দরখাস্তের ফাইল সংগ্রহ করে রেখেছেন। মৃত্যুর আগে সেই ফাইলগুলো তাঁর নাতনীর কাছে জমা রয়েছে। এদেশের ত্রিশ লক্ষ মানুষ মেরে অপরাধীরা কী করে পার পেয়ে যায় সেটা দেখে নিতে চেয়েছিলেন জলিল সাহেব। তিনি দীর্ঘ পিটিশনে বিচার চেয়ে সরকারের কাছে আবেদনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
একদিন মেয়েটির সাথে লেখকের দেখা হয়। তাঁকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় একদিন তিনি এই ফাইল নিয়ে বীর শহীদদের হয়ে লড়বেন। কিন্তু বাস্তবতা মানুষকে অন্যদিকে নিয়ে যায়। লেখক লিখছেন- “আমি জলিল সাহেব নই।ৃ.জলিল সাহেবের বত্রিশ হাজার দরখাস্তের ফাইল নিয়ে রাস্তায় বেরুনোর সময় কোথায়? জলিল সাহেবের নাতনিটি হয়তো আমার জন্য অপেক্ষা করে। দাদুর পিটিশনের ফাইলটি ধুলো ঝেড়ে ঠিকঠাক রাখে। এই বয়েসী মেয়েরা মানুষের কথা খুব বিশ্বাস করে।”
হুমায়ূন আহমেদ তাঁর গল্প কিংবা ফিকশানে পাখির ঠোঁটে ‘তুই রাজাকার’ ধরিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর নির্মিত প্রথম সিনেমা ‘ আগুনের পরশমনি’ আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে। এমন একটি সময়ে তিনি এটা করেছিলেন যখন রাজাকার শব্দটি মুখে আনা যেতো না। আজ স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও বাংলাদেশের পশ্চাদপদ অবস্থা। হুমায়ূন আহমেদের গল্প, সিনেমা ও ফিকশনগুলো এখনো তাই সত্যি হয়ে ওঠে। এখনো কত প্রাসঙ্গিক জাদুকর কথাসাহিত্যিক, নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ !
আমার সাথে হুমায়ূন আহমেদের যোগাযোগ হয়েছে ঢাকায় অমর একুশে বইমেলায়। আমরা তখন কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছি। তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা থেকে ইস্তফা দিয়ে ফুলটাইম লেখালেখি ও নির্মাণ করছেন। একদিন বইমেলায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তাঁর অটোগ্রাফ নিয়েছি। তাঁর ছোট ছোট বাক্যশৈলির মতই ছোট ছোট কথা বলতেন। অটোগ্রাফ দিতে কি করি, কোথায় পড়ি জিজ্ঞেস করলেন। আমারটা শেষে পরের জনের সাথেও একই কর্ম করলেন। যেন কোন তাড়াহুড়ো নেই, আহা !
আমরা তখন ভুষা কাগজে ছাপা শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, ফাল্গুনী, নীহাররঞ্জন বা রোমেনা আফাজ পড়তাম। কখনো সখনো মা-চাচিদের পত্রিকা বেগম থেকে গল্প-উপন্যাস পড়তাম। ঝকঝকে ছাপা বা সৌখিন মলাটের বইগুলোর চড়া দাম—ভাবতাম, ওসব বড়লোকদের বই, আমাদের মতো নিম্ন-মধ্যবিত্তদের জন্য নয়। দোকানে যেয়ে শুধু নেড়েচেড়ে দেখতাম। কিন্তু বন্ধুরা সবাই যে মানুষটার কথা বলে! একেবারে না পড়লে তো তাদের সঙ্গে চলা মুশকিল। বাড়িতে বা বাসায় টেলিভিশন নেই। শুনেছি তাঁর লেখা নাটক মানুষ গোগ্রাসে গিলছে। তাঁর বই কিংবা নাটক কোনোটা পড়া হয়নি, দেখা হয়নি। তাই বন্ধুদের ওইসব আলোচনায় মুখে কুলুপ এটে বসে থাকতাম।
ঢাকায় এসে কলেজে ভর্তি হলাম। বোনের বাসায় থাকি। তখনও তাদের টেলিভিশন কেনা হয়নি। আমাদের পাশের বাসায় এসে উঠলেন কথাসাহিত্যিক ইসহাক খান। একদিন তিনি বাসায় ডাকলেন। আমার আউটবই পড়ার অভ্যাস আছে শুনে খুশি হলেন। তাঁর লেখা গল্প-উপন্যাস ছাপা হতো বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়— পড়তে দিলেন। তিনি সাপ্তাহিক রোববার-এ কাজ করতেন। একদিন তিনি হুমায়ূন আহমেদের সাক্ষাৎকার নিলেন। সাক্ষাৎকারের জন্য তাঁর সাথে সাক্ষাতের বিশাল বর্ননা শুনতাম ভাইয়ের কাছে। তাঁর নাটক হলে টিভিতে দেখতে দিতেন। না, তাঁর বই আর না পড়লে চলেই না। শুনেছি সেসব বইয়ের অনেক দাম। ওদিকে আব্বা যা টাকা পাঠান— প্রাইভেট পড়তেই শেষ হয়ে যায়। এমনকি ফার্মগেট থেকে অর্ধেকের বেশি হাঁটতাম বাসভাড়া বাঁচাতে। অনেকদিন সংসদভবন হয়ে শেরেবাংলানগর পর্যন্ত হেঁটেছি কেবল টাকা বাঁচানোর জন্য।
আমাদের কলেজের পাশেই হলিক্রস কলেজ। দুই কলেজের ঠিক সামনে বেশ কয়েকটি বইয়ের দোকান। আমরা যে দোকান থেকে খাতা-কলম কিনতাম, সেই দোকানদারও বুঁদ হয়ে তাঁর লেখা গল্প-উপন্যাস পড়তেন। আমরা কিছু চাইলে তিনি যে পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়েছেন, সেখান থেকে বই খুলে প্রচ্ছদটা ওপরে রেখে দিতেন। তখন চোখে পড়ত এক চমৎকার নাম আর প্রচ্ছদ। অবশেষে একদিন সাহস করে জমানো টাকা দিয়ে তাঁর দোকান থেকে কিনেই ফেললাম ‘দ্বৈরথ’।এটিই আমার কেনা প্রথম হুমায়ূন আহমেদের বই। কিন্তু একি! চকচকে ছাপার উপন্যাসে তিনি তো আমাদের কথাই লিখেছেন— নুন আনতে পান্তা ফুরায় এমন মানুষের গল্প। তারপর পড়লাম নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার, আমার আছে জল, নির্বাসন, জোছনা ও জননীর গল্পৃউদ্ভট নামের কারণে তাঁর ‘কুটু মিয়া’ উপন্যাসটি পড়িনি অনেকদিন। সম্প্রতি পড়ে বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি।
চিরদিন এই ঘোরেই থাকতে চাই প্রিয় হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে।








