দুর্দান্ত ছন্দে থাকা ব্রাজিলকে আটকাতে পারবে হল্যান্ডের নরওয়ে?
ব্রাজিলের ফুটবল অনেকটা নদীর মতো। কখনো শান্ত, কখনো উন্মত্ত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের ছন্দেই বয়ে চলে।
জাপানের বিপক্ষে শেষ বত্রিশের লড়াইয়ে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রদের খেলায় সেই চিরচেনা স্রোতেরই দেখা মিলেছে। প্রতিপক্ষ লড়েছে, প্রশ্নও ছুড়ে দিয়েছে। কিন্তু ব্রাজিল উত্তর দিয়েছে নিজেদের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে। আক্রমণে গতি, মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ আর মুহূর্তের জাদু—সব মিলিয়ে যেন আবারও জেগে উঠেছিল ‘জোগো বনিতো’র সৌন্দর্য।
বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধের সেই সাম্বা-ছন্দের ঝংকার আজ নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামেও তুলতে চাইবে রেকর্ড পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। তবে এবার সামনে সম্পূর্ণ ভিন্ন দর্শনের এক প্রতিপক্ষ—নরওয়ে। অন্যদিকে ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের অপেক্ষায় আছে স্বাগতিক মেক্সিকো। সে প্রসঙ্গে পরে আসা যাবে।
তার আগে দেখা যাক, ব্রাজিলের সামনে নরওয়ে পরীক্ষাটা কতটা কঠিন হতে পারে। বলা হয়ে থাকে, বিশ্বকাপ যত নক আউটের গভীরে যায়, ফুটবল ততই কৌশল কিংবা পরিসংখ্যানের গণ্ডি ছাড়িয়ে স্নায়ু, সাহস আর মুহূর্তের খেলায় পরিণত হয়। জাপানের বিপক্ষে সেই পরীক্ষায় ব্রাজিল ‘লেটার মার্ক’ পেয়েই পাস করেছে। এশিয়ার চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে শেষ ষোলোতে ব্রাজিলকে এখন সামলাতে হবে ইউরোপীয় যান্ত্রিক নরওয়েকে। ব্রাজিলের জন্য সবচেয়ে বড় সুখবর, পুরো ম্যাচ খেলার মতো ফিট হয়ে উঠেছেন নেইমার।
তবে কোচ কার্লো আনচেলত্তি তাঁকে শুরু থেকেই নামাবেন, নাকি ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে বেঞ্চ থেকে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবেন, এর উত্তর মিলবে কিক-অফের ঠিক আগে। ‘ও (নেইমার) ৯০ মিনিটই খেলতে পারবে। এতে সন্দেহ নেই। তবে ও কতক্ষণ খেলবে, সেটা আগে থেকে বলার সুযোগ নেই। যখনই মনে করব দলের ওকে প্রয়োজন, তখনই ও মাঠে নামবে’—বোঝাই যাচ্ছে নিজের পরিকল্পনার আভাসও দিতে নারাজ আনচেলত্তি।
একদিকে স্বস্তি, অন্যদিকে দুশ্চিন্তা। এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সাম্বা-সুর যেন এমনই। না হলে নেইমার সুস্থ হতে হতেই লুকাস পাকেতা কেন ছিটকে পড়বেন! মাঝমাঠে এই ভরসাকে ছাড়াই নরওয়ে বাধা পেরোতে হবে ব্রাজিলকে।
তবে স্বস্তির খবরও আছে। চোট কাটিয়ে অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠেছেন রাফিনিয়া। অনুশীলনে ফিরলেও তাঁকে একাদশে দেখা যাবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। অবশ্য তাঁর অনুপস্থিতিতে ডান প্রান্তে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন তরুণ উইঙ্গার রায়ান। গতি, দম আর আক্রমণাত্মক প্রেসিংয়ে তিনি এরই মধ্যে ব্রাজিলের অন্যতম আলোচিত মুখ।
ব্রাজিল যেখানে কিছুটা অনিশ্চয়তার মধ্যে, নরওয়ে সেখানে অনেক বেশি স্থিতিশীল। তাদের সবচেয়ে বড় ভরসা আর্লিং হালান্ড, আধুনিক ফুটবলে গোল করার শিল্পকে যিনি প্রায় যন্ত্রের নির্ভুলতায় নামিয়ে এনেছেন। তাঁকে এক মুহূর্তের জন্যও জায়গা দিলে শাস্তি প্রায় অবধারিত। গ্রুপ পর্ব থেকে শেষ বত্রিশ পর্যন্ত সেটাই প্রমাণ করেছেন হালান্ড।
ইতিহাসও নরওয়ের পক্ষেই কথা বলে। ব্রাজিলের বিপক্ষে চারবারের দেখায় তারা কখনো হারেনি—দুটি জয়, দুটি ড্র। তবে ইতিহাস যতই পাশে থাকুক, নক আউটের উত্তাপকে স্বাভাবিক করে তোলার এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে ব্রাজিলের। তবে নরওয়ে চাইবে সাম্বার ছন্দ থামিয়ে উত্তরের বরফ শীতল স্থিরতাকেই শেষ কথা বানাতে।
নরওয়ের মতো একই স্বপ্ন দেখছে মেক্সিকোও। আজতেকায় বিশ্বকাপে হার কী জিনিস, সেই অভিজ্ঞতা নেই তাদের। শেষ বত্রিশে ইকুয়েডরের বিপক্ষে জয় খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাসে নতুন জোয়ার এনে দিয়েছে। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের পর প্রথমবার শেষ ষোলোয় ওঠা মেক্সিকো তাই আরেকটি স্মরণীয় রাতের অপেক্ষায়।








