Sunday 05 July, 2026

হারলেও বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বুকে কাঁপন ধরাল ছোট্ট দ্বীপদেশ কেপ ভার্দে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: 16:14, 4 July 2026

হারলেও বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বুকে কাঁপন ধরাল ছোট্ট দ্বীপদেশ কেপ ভার্দে

হারলেও বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বুকে কাঁপন ধরাল ছোট্ট দ্বীপদেশ কেপ ভার্দে

স্কোরবোর্ডে শেষ পর্যন্ত লেখা থাকবে আর্জেন্টিনা ৩, কেপ ভার্দে ২। ইতিহাসের পাতায়ও ফলাফলটি এভাবেই জায়গা করে নেবে। কিন্তু মায়ামির মাঠে ১২০ মিনিট ধরে যে গল্প লেখা হয়েছে, সেটি কেবল একটি পরাজয়ের গল্প নয়। সেটি ছিল সাহস, আত্মবিশ্বাস আর অসম লড়াইকে মহাকাব্যে পরিণত করার গল্প।

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চাপে রেখে কেপ ভার্দে প্রমাণ করে দিয়েছে, ফুটবলে নামের জৌলুস নয়, লড়াইয়ের মানসিকতাই অনেক সময় সবচেয়ে বড় পরিচয়।

ম্যাচ শুরুর আগে শক্তির বিচারে দু’দলের মধ্যে ব্যবধান ছিল বিশাল। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি আর্জেন্টিনার বিপক্ষে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে আসা কেপ ভার্দেকে কেউই বড় কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভাবেনি। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়েও দু’দলের ব্যবধান ছিল ৬৩ ধাপ। কিন্তু মাঠে নেমে সেই পরিসংখ্যানকে প্রায় অর্থহীন করে দেয় আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপদেশটি।

শুরু থেকেই কেপ ভার্দে আক্রমণ-প্রতিরক্ষার দারুণ সমন্বয় দেখায়। বল হারালেই দ্রুত রক্ষণে নেমে এসেছে, আবার সুযোগ পেলেই একযোগে আক্রমণে উঠে গেছে। পুরো ম্যাচে তাদের ফুটবলে ছিল শৃঙ্খলা, গতি ও আত্মবিশ্বাসের ছাপ। আর্জেন্টিনার মতো দলের বিপক্ষে খেলেও কোথাও ভয় কিংবা জড়তা দেখা যায়নি।

ম্যাচ যত এগিয়েছে, ততই বাড়তে থেকেছে উত্তেজনা। একসময় মনে হচ্ছিল, বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে আরেকটি বড় অঘটনের সাক্ষী হতে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্ব। ম্যাচের আবহ অনেকের কাছেই মনে করিয়ে দিয়েছে ২০২২ বিশ্বকাপের সেই রুদ্ধশ্বাস ফাইনালের কথা। লুসাইল স্টেডিয়ামের মতোই মায়ামির গ্যালারিতেও ছিল টানটান উত্তেজনা।

এই ম্যাচে লিওনেল মেসি নিজের স্বাভাবিক ছন্দে থাকার চেষ্টা করলেও বারবার বাধা হয়ে দাঁড়ান কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। প্রথমার্ধে মেসি একবার জালের দেখা পেলেও এরপর একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে দেন অভিজ্ঞ এই গোলরক্ষক। ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে মেসিকে হতাশ করেছেন, ফ্রি-কিক থেকেও ফিরিয়ে দিয়েছেন নিশ্চিত গোল। পুরো ম্যাচে ভোজিনিয়া করেছেন আটটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ, যা ম্যাচের অন্যতম বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

বিশেষ করে কয়েকটি সেভ ছিল অসাধারণ। নিজের শরীরকে বলের সামনে নিখুঁতভাবে রেখে যেভাবে তিনি আর্জেন্টিনার আক্রমণ ভেস্তে দিয়েছেন, তাতে বোঝা গেছে কেন ফুটবলে একজন গোলরক্ষক একাই ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন। প্রায় ৪০ বছর বয়সেও তার ক্ষিপ্রতা ও সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ছিল ঈর্ষণীয়। বিশ্বসেরা ফুটবলারের বিপক্ষেও তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, সাহস আর প্রস্তুতি থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।

কেপ ভার্দের আক্রমণভাগও কম চোখে পড়েনি। বিশেষ করে অতিরিক্ত সময়ের ১০৩ মিনিটে সিডনি কাবরালের গোলটি ম্যাচের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হয়ে থাকবে। বাঁ দিক থেকে বল নিয়ে ভেতরে ঢুকে ডান পায়ের নিখুঁত বাঁকানো শটে তিনি বল জড়ান দূরের ওপরের কোণে। আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজের কিছুই করার ছিল না। গোলের পর গ্যালারিতে ছুটে গিয়ে প্রিয়জনকে খুঁজে নিয়ে তার উদ্‌যাপন ম্যাচটিকে আরও আবেগঘন করে তোলে।

আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতা ও মানের পার্থক্যে জয় নিশ্চিত করলেও সেই জয় মোটেও সহজ ছিল না। কেপ ভার্দে একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে রেখেছে এবং শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত জয় না পেলেও তারা দর্শকদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে।

এই ম্যাচ কেপ ভার্দের জন্য ছিল অনেক কিছু অর্জনের সুযোগ। ট্রফি বা জয় না এলেও তারা পেয়েছে বিশ্ব ফুটবলপ্রেমীদের সম্মান, ভালোবাসা এবং স্বীকৃতি। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ভয়হীন ফুটবল খেলে তারা দেখিয়ে দিয়েছে, বিশ্বকাপের মঞ্চে ছোট দল বলে কিছু নেই। সঠিক পরিকল্পনা, আত্মবিশ্বাস এবং সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকলে যে কোনো দলই পরাশক্তিদের কঠিন পরীক্ষায় ফেলতে পারে।

ফলাফলের হিসেবে কেপ ভার্দে বিদায় নিয়েছে পরাজিত দল হিসেবে। কিন্তু পারফরম্যান্সের বিচারে তারা হয়ে উঠেছে এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিয়ে কেপ ভার্দে এমন এক স্মৃতি উপহার দিয়েছে, যা অনেক দিন ধরে ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনায় থাকবে। কখনো কখনো পরাজয়ও জয়ের চেয়ে বেশি সম্মান এনে দেয় মায়ামির এই ম্যাচটি তারই উজ্জ্বল উদাহরণ।

 

News Editor : Fokhrul Islam