ভিসা বাণিজ্যে বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকার অঘোষিত লেনদেন
বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ পাড়ি জমালেও তাদের একটি বড় অংশকে গুনতে হচ্ছে সরকার নির্ধারিত ব্যয়ের কয়েক গুণ বেশি অর্থ। কাজের অনুমতিপত্র বা ভিসা কেনাবেচা, মধ্যস্বত্বভোগীদের কমিশন ও বিভিন্ন পর্যায়ের অননুমোদিত লেনদেনে বছরে অন্তত ৩০ হাজার কোটি টাকার অঘোষিত লেনদেন হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
বিদেশ যাওয়ার আগে অনেক কর্মী জানেন না তারা কোন প্রতিষ্ঠানে কী কাজ করবেন, বেতন কত কিংবা চাকরির শর্ত কী। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তার প্রকৃত চুক্তিপত্রও পান না তারা। চুক্তিপত্র পেলেও বিদেশে গিয়ে দেখা যায়, কাজ, বেতন কিংবা নিয়োগকর্তার সঙ্গে এর মিল নেই।
এক প্রতিবেদনে বণিক বার্তা প্রকাশ করে, নোয়াখালীর তৈয়ব আলী এর শিকার।
পাঁচ লাখ ৩০ হাজার টাকা খরচ করে সৌদি আরব গিয়েছিলেন তিনি। এর মধ্যে সাড়ে তিন লাখ টাকা ছিল ঋণের। বাকি অর্থ জোগাড় করেছিলেন গরু ও স্ত্রীর গহনা বিক্রি এবং আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার করে। প্যাকেজিংয়ের কাজের কথা থাকলেও সেখানে গিয়ে প্রায় দুই মাস বসে থাকতে হয় তাকে।
পরে কনস্ট্রাকশন প্রতিষ্ঠানে অস্থায়ী কাজ পেলেও নিয়মিত বেতন পাননি। শেষ পর্যন্ত ছয় মাসের মধ্যে দেশে ফেরেন তিনি।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে শীর্ষ ১০ দেশে গেছেন ১০ লাখ ৭১ হাজার ৯৩৪ জন। সরকার নির্ধারিত হারে তাদের অভিবাসন ব্যয় হওয়ার কথা ছিল প্রায় ১৬ হাজার ৬১০ কোটি টাকা।
কিন্তু মাঠ পর্যায়ে পাওয়া সর্বনিম্ন ব্যয় হিসাব করেও তা দাঁড়ায় ৫৮ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ ব্যবধান প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা।
বর্তমানে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যেতে একজন কর্মীর চার থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। সৌদি আরবে গড়ে পাঁচ লাখ টাকা এবং সিঙ্গাপুরে ১৫-১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে বলে মাঠপর্যায়ের তথ্য পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ আর্থসামাজিক ও জনমিতিক জরিপে দেখা যায়, বিদেশগামী কর্মীদের মোট অভিবাসন ব্যয়ের ৫২ দশমিক ৩ শতাংশ যায় দালাল বা মধ্যস্থতাকারীদের হাতে। ৪২ দশমিক ৯ শতাংশ যায় রিক্রুটিং এজেন্সির কাছে। সরাসরি সরকারি প্রতিষ্ঠানে যায় মাত্র ৩ দশমিক ৯ শতাংশ।
সৌদি আরবে কর্মী সরবরাহকারী বাংলাদেশি এজেন্ট জাকারিয়া সিকদার জানান, একটি কাজের অনুমতিপত্র সৌদি আরবে প্রায় দুই লাখ টাকায় পৌঁছে যায়। পরে বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি, সাব-এজেন্ট ও দালালের মাধ্যমে কয়েক দফা হাতবদল হওয়ার সময় প্রতিটি ধাপে কমিশন যুক্ত হয়। ফলে প্রাথমিক খরচের তুলনায় ভিসার দাম তিন-চার গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬ সালে শুধু ভিসা কেনার জন্য আনুমানিক পাঁচ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। পরে এসব ভিসা কর্মীদের কাছে বিক্রি করে আদায় করা হয় প্রায় ১৬ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশি নিয়োগকর্তার প্রকৃত চাহিদা, কাজ ও বেতনের নিশ্চয়তা ছাড়াই ভিসা কেনাবেচার কারণে অভিবাসন ব্যয় বাড়ছে। অনেক পরিবার ভিটামাটি, গয়না বিক্রি কিংবা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বিদেশে যাওয়ার খরচ জোগাড় করছে। অথচ বিদেশে গিয়ে কাজ না পাওয়ায় তাঁদের অনেকেই ঋণের বোঝায় পড়ছেন।
এ বিষয়ে বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে বিএমইটির অধীনে কেন্দ্রীয় ডাটাব্যাংক এবং নির্ধারিত ব্যাংকিং চ্যানেলে সব অর্থ লেনদেন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, দক্ষতা ও ভাষাগত যোগ্যতার ঘাটতির কারণে বাংলাদেশি কর্মীদের দর-কষাকষির সক্ষমতা কম। এতে বিদেশি মধ্যস্বত্বভোগী ও সাপ্লাই কম্পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক বলেন, সরকার দেশভিত্তিক অভিবাসন ব্যয় হালনাগাদ করার উদ্যোগ নিয়েছে। নির্ধারিত ব্যয়ের বাইরে কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সোর্স: কালের কন্ঠ








