সড়কমন্ত্রীর দাবি সফল ঈদযাত্রা ম্যানেজ করতে সক্ষম
রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনাল পরিদর্শন শেষে গত ২৭শে মে, বুধবার দুপুরে সাংবাদিকদের উদ্দেশে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম দাবি করেন, নির্ধারিত ভাড়ায় ও শৃঙ্খলার সঙ্গে যাত্রীরা গন্তব্যে যেতে পারছে। সবকিছু মিলিয়ে একটা ভালো ঈদযাত্রা ম্যানেজ করতে সক্ষম হয়েছি।
যদিও পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। নির্ধারিত ভাড়ায় খুব কম পরিবহনই যাত্রী পরিবহন করেছে। প্রধান কয়েকটি বাস সার্ভিস বাদে বাকি সব বাস, লঞ্চ অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেছে যাত্রীদের জিম্মি করে। এমনকি রেলের যাত্রীরাও অনলাইনে টিকেট কিনতে পারেননি। কিন্তু ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফরম থেকে অতিরিক্ত দামে টিকেট সংগ্রহ করে তবে বাড়ি যেতে পেরেছেন, এমন চিত্র দেখা গেছে।
আর সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো সড়ক দুর্ঘটনা। মন্ত্রী যে শৃঙ্খলার দাবি করেছেন, তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি।
আজ জুন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে যাত্রী কল্যাণ বিষয়ক সংস্থা- বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এক সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরলেন ভয়ানক চিত্র। সংস্থাটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানান, চলতি বছরের ঈদুল আজহার যাতায়াত মৌসুমে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৪০২ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৯৪ জন আহত হয়েছেন।
মোট ৩৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় এই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। মোজাম্মেল হক জানান, ঈদের যাতায়াত শুরুর দিন ২১শে মে থেকে ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার শেষ দিন ৪ঠা জুন পর্যন্ত ১৫ দিনে এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে।
গত বছরের ঈদুল আজহার সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ বছর সড়ক দুর্ঘটনা ৩.৯৫ শতাংশ, নিহতের সংখ্যা ৩.০৭ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যা ৯.৪৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে — যা পরিস্থিতির ক্রমাবনতির স্পষ্ট ইঙ্গিত।
শুধু সড়কপথ নয়, এই সময়কালে দেশের রেল ও নৌপথেও দুর্ঘটনার বিপজ্জনক চিত্র দেখা গেছে।
মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানান, ৩১টি রেল দুর্ঘটনায় ২৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৩০ জন। একই সময়ে নৌপথে ১৭টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩ জন এবং আহত হয়েছেন ১৬ জন।
সড়ক, রেল ও নৌপথ মিলিয়ে মোট ৪৪২টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪৩৮ জন এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ৩৪০ জন।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবারও মোটরসাইকেল শীর্ষে রয়েছে। ১৫৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৮.৮৩ শতাংশ।
সংবাদ সম্মেলনে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে মোজাম্মেল হক চৌধুরী অভিযোগ করেন, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় বাস মালিকদের “প্রেসক্রিপশন” অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পরিবহন মালিক সমিতির সদস্যদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পরিবহন মালিকরা “মাফিায়” পরিণত হন। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন যানজট গবেষক ড. এ ওয়াই এম একরামুল হক।
তিনি বলেন, ঈদের ছুটিতে প্রায় ১ কোটি মানুষ ঢাকা ছেড়ে যান এবং এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। ঢাকামুখী চাপ কমাতে সারাদেশে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবার মানসম্পন্ন সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলার পাশাপাশি নীতিসহায়তা ও কর অবকাশ সুবিধা দিয়ে বিভিন্ন জেলায় কারখানা স্থাপনের পরামর্শ দেন তিনি।
ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। এর মধ্যে রয়েছে বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত খানাখন্দে ভরা সড়ক, যানবাহনের ত্রুটি এবং চালকদের বেপরোয়া ও আইনবিরোধী মনোভাব। এছাড়া চালক স্বল্পতার কারণে ঘুম না ঘুমিয়ে একটানা গাড়ি চালানো, অতিরিক্ত মুনাফার লোভে মেয়াদোত্তীর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ বাস চালানোকেও দায়ী করেছে সংস্থাটি।








