Wednesday 26 August, 2026

নিরাপত্তাহীন নাগরিক, নির্বিকার খুনি—রাষ্ট্র কোথায়?

শাহানা হুদা রঞ্জনা

প্রকাশিত: 10:37, 26 August 2026

নিরাপত্তাহীন নাগরিক, নির্বিকার খুনি—রাষ্ট্র কোথায়?

নিরাপত্তাহীন নাগরিক, নির্বিকার খুনি—রাষ্ট্র কোথায়?

রংপুরে ৪ জনকে খুন করে বাসায় বসেই খেজুর, শসা খেয়েছে খুনিরা। শুধু তাই নয়, তারা গোসলও করেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। চারজনকে খুন করে দ্রুত পালিয়ে না গিয়ে, নিস্পৃহভাবে মানুষ যে খাওয়া-দাওয়া করতে পারে, এই দৃশ্যটা কোনো স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন।

শুধু তাই নয়, মৃতদের চেহারাও নাকি তারা অ্যাসিড দিয়ে ঝলসে দিয়েছে। নৃশংসভাবে খুন করার পর, সেইসব বিকৃত মৃতদেহকে সামনে রেখে স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারার মানসিকতা যে বাড়ছে, তা এখন বলাই বাহুল্য।

বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণ করলেই আমরা দেখতে পারছি, হত্যা করার ক্ষেত্রে অপরাধীরা একদিকে পৈশাচিক পন্থা অবলম্বন করছে, অন্যদিকে হত্যা করার পরও খুনি ভাবলেশহীন থাকছে। এমনকি বিচারের মুখোমুখি হয়েও তাদের মধ্যে কোনো ভাবান্তর নেই।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো আছে, শুধু এটা বলে জনগণের উদ্বেগ দূর করা যাবে না। মানুষের মধ্যে যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে, সেটি খুব গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া দরকার। কারণ মানুষ বুঝতে পারছে, বাস্তবতা হলো, পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

আমাদের সকাল হচ্ছে গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের মতো ঘটনা শুনে, রাতে ঘুমাতে যেতে হচ্ছে এই রকমই অন্য কোনো বীভৎস ঘটনার কথা জেনে। নিউজ মিডিয়ার ফিডে ক্রমাগত ভেসে আসছে হত্যা, ধর্ষণ, মব সন্ত্রাস, নারীর প্রতি সহিংসতা ও অন্যান্য দুর্ঘটনার খবর।

নিত্যনৈমিত্তিক এইসব ভয়াবহ ঘটনা আমাদের কাছে খুব সাধারণ হয়ে উঠছে। ধরেই নিয়েছি, যেকোনো সময়, যেকোনো পরিবারে রংপুরের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের মতো পরিণতি ঘটে যেতে পারে।

এমনকি বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, “প্রতি মাসে কমবেশি ৩০০-এর মতো খুনের ঘটনা ঘটছে। গড়ে প্রতিদিন ১০টা করে খুন যেন আমাদের ভাগ্যে লেখা রয়েছে।” (সূত্র: বিবিসি বাংলা)

ভয় হচ্ছে, প্রতিদিন ১০টা করে খুনের খবর আমাদের মধ্যে ‘নার্কোটাইজিং ডিসফাংশন’ তৈরি করছে কি না? এই ‘নার্কোটাইজিং ডিসফাংশন’ সমাজবিজ্ঞান ও গণযোগাযোগের ক্ষেত্রে এমন একটি অবস্থা বোঝায়, যেখানে গণমাধ্যম অতিরিক্ত তথ্য ও সংবাদ পরিবেশন করে মানুষের চেতনাকে অসাড় করে তোলে। ফলে তারা কেবল তথ্য জেনেই সন্তুষ্ট থাকে, কিন্তু বাস্তবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ বা প্রতিবাদ করে না।

পল লাজারসফেল্ড এবং রবার্ট মার্টন ১৯৪৮ সালে এই ধারণাটি দেন। তারা বলেন, চেতনা অসাড় হয়ে গেলে, মানুষ তথ্য জেনেও কোনো বাস্তব পদক্ষেপ নেয় না। যোগাযোগমাধ্যম থেকে যে অসংখ্য তথ্য পায়, তা সমাজের সমস্যাগুলোর প্রতি কেবল একটি উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

এর ফলে সমাজের আসল বা বাস্তব পদক্ষেপগুলো উপেক্ষিত হয়, আর এই অগভীর উদ্বেগ দিয়ে ভেতরের গণ-উদাসীনতাকে ঢেকে রাখা হয়। তাই, এটিকে ‘ডিসফাংশনাল’ বা অকার্যকর বলা হয়। কারণ রাজনৈতিকভাবে উদাসীন ও জড় একটি ‘নিষ্ক্রিয় সমাজ’ মানুষের জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না।

প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে খুন ও ধর্ষণ-সংক্রান্ত যে অসংখ্য খবর দেখতে পারছি, সেটা কি আমাদের বাস্তব পদক্ষেপ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে? কোনো রোমহর্ষক খুন বা ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে বিভিন্ন মিডিয়াজুড়ে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার এবং কান্নার ভিডিও দেখতে দেখতে একপর্যায়ে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

অনলাইনে “জবাবদিহিতা চাই” বা “আর কত” লিখে ক্ষোভ প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ মনে করে। কিন্তু নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাস্তব কোনো সামাজিক আন্দোলনে অংশ নেয় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রেও একই আশঙ্কা সত্য হতে পারে।

পৈশাচিক কায়দায় মানুষ হত্যার বা ধর্ষণ করার দৃশ্য ভিডিও করে সামাজিক মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে অন্যরা দেখে বিকৃত আনন্দ পায় ও একধরনের অভ্যস্ততা তৈরি হয়। কিন্তু এই ‘নার্কোটাইজিং ডিসফাংশন’ তো মানুষের জন্য স্বাভাবিক হতে পারে না। প্রায় শতভাগ মানুষ একবেলা খেয়েও, পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরাপদে বসবাস করতে চায়। কিন্তু সেই নিরাপদে থাকাটাই তো হচ্ছে না।

অন্য সব সূত্র বাদ দিলেও, খোদ বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুনে মোট ১,৭৭৮টি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাছাড়া এগুলো পুলিশে নিবন্ধিত হত্যা মামলার হিসাব, নিহত মানুষের সংখ্যা নয়। একই মামলায় একাধিক নিহত ব্যক্তি থাকতে পারেন। পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া এই তথ্য কি দেশের জন্য উদ্বেগজনক নয়?

হত্যার কারণ কী কী হতে পারে, এককথায় এর কোনো উত্তর নেই। একদিকে যেমন খুব তুচ্ছ কারণেও মানুষ মানুষকে হত্যা করার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে হত্যার ধরনেও ক্রুরতা বেড়েছে। অপরাধীদের মধ্যে সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ লক্ষ করা যাচ্ছে, পাশাপাশি বেড়েছে মব সহিংসতা।

মানুষ বেশি হিংস্র হয়ে গেছে, তাই খুন বাড়ছে—খুন বাড়ার কারণ শুধু এটি নয়। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, অপরাধ করার ঝুঁকি কমে গেছে বা দায় নিতে হয় না। অন্যভাবে বলা যায়, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা মানুষকে সহিংস করে তুলছে।

অপরাধবিজ্ঞানের একটি মৌলিক ধারণা হলো, অপরাধ করলে দ্রুত ও নিশ্চিতভাবে শাস্তি হবে—এই বিশ্বাস অপরাধ কমাতে সাহায্য করে। আর তা যদি না হয়, তাহলে অপরাধ বাড়বেই, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যা ঘটছে।

তাছাড়া যখন মানুষ দেখে যে বিরোধ মেটাতে শক্তি দেখালে, প্রতিশোধ নিয়ে অপমানের জবাব দিলে এবং ক্ষমতার কারণে ভয় দেখানো যায়, তখন যেকোনো ধরনের সহিংসতা ‘স্বাভাবিক’ আচরণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। এই অস্বাভাবিক ‘স্বাভাবিকতা’ থেকেই মানুষ হত্যার মতো অপরাধ করার ক্ষেত্রে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে।

অপরাধ করে দিনের পর দিন যখন অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, তখন একদিকে অপরাধী নিজেকে শক্তিশালী ভাবতে শেখে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ভেতর এই ধারণা তৈরি হয় যে এভাবে অপরাধ করে তারাও পার পেয়ে যেতে পারবেন।

এবার প্রশ্ন, অপরাধ দমনে সরকার কি যথেষ্ট দৃষ্টি দিচ্ছে? অধিকাংশ মানুষ মনে করছেন, অপরাধ দমনে বা অপরাধী ধরার ক্ষেত্রে সরকার ততটা সক্রিয় নয়। অথচ সরকারের উচ্চপদস্থ সবাই বলছেন, তারা কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। এই কথা বলারও প্রায় তিন মাস হতে চলল, কিন্তু প্রশ্নটা রয়েই গেল: সরকার কী বলছে, আর মাঠে কী ঘটছে। পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, চুরি-ডাকাতির পরিমাণ আগের চেয়ে কিছুটা কমলেও খুন বা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।

“যেভাবে খুন, সহিংসতার মতো অপরাধগুলো বাড়ছে, তা দমনে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। এজন্য সরকারের বিশেষায়িত অভিযান পরিচালনা করা দরকার। ২০২৪ সালের আগস্টের পর পুলিশের অনেকেই ডিমোরালাইজড হয়ে গেছে। অনেকেই ভীতি নিয়ে কাজ করছে।” (অপরাধবিজ্ঞানী অধ্যাপক উমর ফারুক)

জুনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় ভালো হয়েছে। একই সময়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ তথ্য প্রকাশ করেছে যে ১০০ দিনে ৬০৫টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে।

মানবাধিকারকর্মী এলিনা খান বলেছেন, “এটা একটা নির্বাচিত সরকার। মানুষ চায় নিরাপত্তা। যে কোনো মূল্যে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এটির নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে।” (বিবিসি বাংলা)

হত্যার সংখ্যা নিয়ে কোন সংস্থা কী হিসাব দিচ্ছে, এটাকে যদি সরকার গুরুত্ব নাও দেয়, কিন্তু হত্যাকাণ্ড বাড়ছে এবং বাড়ছে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পৈশাচিক পদ্ধতি—এটা তো মানতেই হবে। বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ কতটা? অনেক ‘কথা’ বলা হচ্ছে, কিন্তু ‘কার্যকর ব্যবস্থা’ কি নেওয়া হচ্ছে?

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো আছে, শুধু এটা বলে জনগণের উদ্বেগ দূর করা যাবে না। মানুষের মধ্যে যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে, সেটি খুব গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া দরকার। কারণ মানুষ বুঝতে পারছে, বাস্তবতা হলো, পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

যেকোনো অপরাধ, বিশেষ করে এ ধরনের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের প্রতিকারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রাষ্ট্রের ভূমিকা ও দায়বদ্ধতা। রাষ্ট্রকে সেই দায় নিতেই হবে, দেশের ও জনগণের কল্যাণে।