হুমায়ুন কবিরের পাঁচ কোম্পানি, ত্যাগ করেননি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার মধ্যে যুক্তরাজ্যের সরকারি কোম্পানি নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ কোম্পানিজ হাউসের নথিতে তাঁর সঙ্গে মিলে যায় এমন একজন ‘হুমায়ুন কবির’-এর তথ্য পাওয়া গেছে। ওই ব্যক্তির জন্ম আগস্ট ১৯৭৯, জাতীয়তা ব্রিটিশ এবং বসবাসের দেশ যুক্তরাজ্য। ২০১৬ সাল থেকে তাঁর নামে যুক্তরাজ্যে পাঁচটি কোম্পানিতে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের রেকর্ড রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি কোম্পানি এখনো সক্রিয়।
কোম্পানিজ হাউসের নথিতে থাকা ব্যক্তির তথ্যের সঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের প্রকাশ্য জীবনবৃত্তান্তের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। জন্মসাল ও জন্মমাস, যুক্তরাজ্যে দীর্ঘদিন বসবাস এবং ব্রিটিশ নাগরিকত্ব—এসব তথ্যের মধ্যে মিল পাওয়া যায়। ফলে নথিতে থাকা ব্যক্তি এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী একই ব্যক্তি কি না, সেই প্রশ্নে শক্তিশালী তথ্যগত মিল রয়েছে।
তবে এ নথি থেকে রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত করা যায় না। আবার কোম্পানিজ হাউসে কারও জাতীয়তা ‘ব্রিটিশ’ লেখা থাকলেই তিনি নির্দিষ্ট একটি তারিখে আইনগতভাবে ব্রিটিশ নাগরিক ছিলেন—এমন সিদ্ধান্তও সরাসরি দেওয়া যায় না। কারণ কোম্পানির নথিতে থাকা তথ্য হালনাগাদ না-ও হয়ে থাকতে পারে। তাহলে প্রশ্ন হলো, হুমায়ুন কবির যদি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করে থাকেন, তিনি কবে তা করেছেন? আর সেই নাগরিকত্ব ত্যাগ কার্যকর হওয়ার প্রমাণ কোথায়?
কোম্পানিজ হাউসের ব্যক্তিগত দায়িত্বসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, ‘হুমায়ুন কবির’ নামের ওই ব্যক্তির যুক্তরাজ্যে মোট পাঁচটি কোম্পানিতে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের তথ্য রয়েছে।
কোম্পানিগুলো হলো গোল্ড অ্যাবি লিমিটেড, কেবিআর প্রপার্টি এস্টেটস লিমিটেড, কেবিআর প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড, কেবিআর২ প্রপার্টি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড এবং এইচকেএডি লিমিটেড। এর মধ্যে গোল্ড অ্যাবি লিমিটেড ও কেবিআর প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড বর্তমানে বন্ধ। অন্য তিনটি কোম্পানি সক্রিয় রয়েছে।
এই তিন সক্রিয় কোম্পানির নথিতে তাঁর ঠিকানা হিসেবে লন্ডনের ফ্ল্যাট ২৮৪, ৪১ মিলহারবার, লন্ডন, ই১৪ ৯এনএইচ ঠিকানা দেওয়া হয়েছে। তাঁর জন্ম আগস্ট ১৯৭৯, জাতীয়তা ব্রিটিশ এবং বসবাসের দেশ যুক্তরাজ্য—এ তথ্যও নথিতে রয়েছে।
কোম্পানিজ হাউসের তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যক্তির সবচেয়ে পুরোনো কোম্পানি-সংশ্লিষ্টতার রেকর্ড ২০১৬ সালের। ২০১৬ সালের ১৯ জুলাই তিনি গোল্ড অ্যাবি লিমিটেডের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান। কোম্পানিটি এখন বন্ধ।
এরপর ২০২১ সালে তিনি কেবিআর প্রপার্টি এস্টেটস লিমিটেড ও কেবিআর প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডে যুক্ত হন। একই বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি কেবিআর২ প্রপার্টি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের পরিচালক হিসেবেও তাঁর নাম যুক্ত হয়।
২০২২ সালের ১৫ মার্চ তিনি এইচকেএডি লিমিটেডের পরিচালক হন। কোম্পানিজ হাউসের বর্তমান নথিতে এই কোম্পানির একমাত্র কর্মকর্তা হিসেবেও তাঁর নাম রয়েছে।
কোম্পানিগুলোর ব্যবসার ধরনও এই অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ। এইচকেএডি লিমিটেডের ব্যবসার ধরন হিসেবে নিজস্ব সম্পত্তি কেনাবেচা এবং নিজস্ব বা ইজারা নেওয়া সম্পত্তি ভাড়া দেওয়া ও পরিচালনার কথা উল্লেখ রয়েছে। কেবিআর প্রপার্টি এস্টেটস লিমিটেডও নিজস্ব সম্পত্তি কেনাবেচার ব্যবসা হিসেবে নিবন্ধিত। কোম্পানিটি ২০২১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত এবং বর্তমানে সক্রিয়।
অর্থাৎ, কোম্পানিজ হাউসের প্রকাশ্য নথিতে যে তিনটি সক্রিয় কোম্পানিতে হুমায়ুন কবির নামের ব্যক্তির সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর বড় অংশই যুক্তরাজ্যের সম্পত্তি কেনাবেচা, ভাড়া দেওয়া ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে কোনো কোম্পানির সম্পদকে সংশ্লিষ্ট পরিচালকের ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আইনগতভাবে কোম্পানি ও পরিচালকের সম্পদ আলাদা।
কোম্পানিজ হাউসের নথিতে থাকা ‘হুমায়ুন কবির’ এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির একই ব্যক্তি কি না, সেটি নিশ্চিত করার মতো সরাসরি কোনো পরিচয়পত্র বা সরকারি নথি এই অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। তবে বেশ কিছু তথ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে।
প্রথম মিল জন্মসালে। উভয় ক্ষেত্রেই ১৯৭৯ সাল পাওয়া যায়। কোম্পানিজ হাউসের নথিতে জন্মমাস আগস্টও উল্লেখ রয়েছে।
দ্বিতীয় মিল যুক্তরাজ্যের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির শৈশবে যুক্তরাজ্যে যান এবং সেখানে দীর্ঘ সময় বসবাস ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে তাঁর প্রকাশ্য জীবনবৃত্তান্ত ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে তথ্য রয়েছে।
তৃতীয় মিল ব্রিটিশ নাগরিকত্ব। কোম্পানিজ হাউসের নথিতে ওই হুমায়ুন কবিরের জাতীয়তা ‘ব্রিটিশ’ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। চতুর্থ মিল লন্ডনে অবস্থান। কোম্পানিগুলোর নথিতে একই লন্ডনের ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে।
এই মিলগুলো একসঙ্গে বিবেচনা করলে কোম্পানিজ হাউসের নথিতে থাকা ব্যক্তি এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী একই ব্যক্তি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্নটি গুরুত্ব পায়। তবে শুধু কোম্পানিজ হাউসের নথির ভিত্তিতে এটিকে চূড়ান্ত পরিচয় হিসেবে ঘোষণা করা যায় না।
হুমায়ুন কবির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্বের বিষয়টি আলোচনায় আসে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৬ ও ৬৬ ধারার কারণে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অনির্বাচিত কোনো ব্যক্তিকে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী করা হলেও তাঁকে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা পূরণ করতে হয়।
সংবিধানের ৬৬(২)(গ) ধারায় বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ বা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের বিষয়টি সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে।
এ কারণেই হুমায়ুন কবিরের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন শুধু তিনি কখনো ব্রিটিশ নাগরিক ছিলেন কি না, তা নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার সময় তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্বের আইনগত অবস্থান কী ছিল।
২৪ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় হুমায়ুন কবিরকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়, তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না।
তবে তিনি প্রশ্নটির সরাসরি উত্তর দেননি। তিনি বলেন, ‘আমি বাংলাদেশি’। তাঁর বাংলাদেশি নাগরিকত্ব বা দেশের প্রতি অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন। এরপর বিষয়টি নিয়ে কোন সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন করেছে, তা জানতে চান এবং বলেন, ‘কার এত জ্বালা’।
অর্থাৎ, তাঁর বক্তব্যে তিনি নিজের বাংলাদেশি পরিচয় ও দেশের প্রতি অবস্থানের কথা বলেছেন। কিন্তু ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগের তারিখ, নাগরিকত্ব ত্যাগের সনদ কিংবা এ-সংক্রান্ত কোনো সরকারি নথির কথা তিনি উল্লেখ করেননি।








