Thursday 27 August, 2026

‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ ছেড়ে সামরিক জোট অংশ নিয়ে কী পাবে বাংলাদেশ!

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: 14:54, 26 August 2026

আপডেট: 14:55, 26 August 2026

‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ ছেড়ে সামরিক জোট অংশ নিয়ে কী পাবে বাংলাদেশ!

‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ ছেড়ে সামরিক জোট অংশ নিয়ে কী পাবে বাংলাদেশ!

কূটনৈতিক স্তরে বাহবা কুড়ানোর মতো মনে হলেও, সদ্যগঠিত এই মক্কা জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় কিছু ঝুঁকি আছে। সৌদি আরব, তুরস্ক আর পাকিস্তানকে নিয়ে গঠিত ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ বা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়টি এখন বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের টেবিলে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই জোটে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব ঢাকাকে বেশ ভাবাচ্ছে। প্রস্তাবটি শুনতে বেশ আকর্ষণীয় বটে—তিনটি প্রভাবশালী মুসলিমপ্রধান দেশের সঙ্গে শক্তিশালী সামরিক অংশীদারি এবং ন্যাটো জোটের আদলে একটি ঘোষণা যে, ‘একজনের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা’। কিন্তু বৈদেশিক নীতি তো আর কেবল আবেগ বা প্রতীক দিয়ে চলে না!
বাংলাদেশের জন্য এই জোটে জড়ানো মানে হলো—বিনা লাভে এক বিশাল ও অনিশ্চিত বিপদের বোঝা ঘাড়ে নেওয়া। দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনীতি, সামরিক সামর্থ্য এবং দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্র নীতির ধারা—সব কিছুই ইঙ্গিত দেয় যে, কোনো সামরিক জোটের সদস্য হয়ে নিজের কূটনৈতিক স্বাধীনতা বা নমনীয়তা বিসর্জন দেওয়ার আগে সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ভাবতে হবে।

মক্কা চুক্তিটি হয়তো সৌদি আরব, তুরস্ক কিংবা পাকিস্তানের নিজস্ব কৌশলগত প্রয়োজনে দারুণ এক পদক্ষেপ হতে পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তা বাংলাদেশের জন্যও সমানভাবে উপকারী। ঢাকার সবার আগে নিজেকে যে প্রশ্নটি করা উচিত, তা হলো : ঠিক কোন নিরাপত্তা সংকট মোকাবেলা করতে এই জোটে জড়াতে চাইছে বাংলাদেশ? বাংলাদেশ এমন এক ভূখণ্ডে অবস্থিত যার চারপাশের মনোযোগ মূলত বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর, ভারত সীমান্ত, মিয়ানমার আর রোহিঙ্গা সংকট ঘিরে। দেশের প্রধান অগ্রাধিকার হলো—সমুদ্রের নিরাপত্তা রক্ষা করা, দেশের সীমান্ত সামলানো, সন্ত্রাস দমন করা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।

অথচ এই জোটে থাকা বাকি দেশগুলোর অগ্রাধিকার সম্পূর্ণ আলাদা।

সৌদি আরবের মূল চিন্তা পারস্য উপসাগরের সুরক্ষা, ইরানের হুমকি আর জ্বালানি তেল সরবরাহের নিরাপত্তা নিয়ে। তুরস্কের নজর সিরিয়া, ইরাক কিংবা কৃষ্ণসাগরের রাজনীতির দিকে। আর পাকিস্তান মূলত ভারত ও আফগানিস্তানকেন্দ্রিক ভূরাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত।

তাহলে ভাবা উচিত যে জোটের মূল কেন্দ্রবিন্দু দেশের সীমানা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে, সেখানে গিয়ে জড়িয়ে পড়া কি বুদ্ধিমানের কাজ হবে? এই জোটে পাকিস্তানের উপস্থিতি দৃশ্যত ভারতের জন্য আরেকটি বড় অস্বস্তির বিষয়।

১৯৭১ সালের পর, সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কে বরফ গলছে। এটি ইতিবাচক হলেও পররাষ্ট্র নীতিতে ইতিহাস সব সময়ই এক বড় ফ্যাক্টর।

যেহেতু বাংলাদেশের জন্মই হয়েছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে, তাই দেশের মানুষের মনে সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার চেতনা সবসময়ই এক পবিত্র জায়গাজুড়ে আছে। পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো সামরিক জোটে নাম লেখানো মানে প্রকারান্তরে তাদের কৌশলগত বিরোধগুলোকে নিজের কাঁধে টেনে নেওয়া। বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যে চিরন্তন দ্বন্দ্ব, আফগানিস্তানের সঙ্গে দ্বন্দ্ব— সেগুলোর অংশীদার হওয়ার কোনো জাতীয় স্বার্থ বাংলাদেশের নেই।

অনেকে ভারতকে কৌশলগতভাবে চাপে রাখতে বাংলাদেশের মক্কা জোটে যোগ দেওয়া পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। তবে এটিও মনে রাখা দরকার যে ভৌগোলিক বাস্তবতায় প্রতিবেশীদের পাশ কাটানোর সুযোগ নেই। প্রতিবেশী বদলানো যায় না। প্রতিবেশীদের সঙ্গে বৈরিতা তৈরি না করে পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়াটা যে কোনো দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

যেমন বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী দুই প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমার—দুই দেশের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক রাখা জরুরি। মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ চলছে। রোহিঙ্গা সংকটের কারণে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া বা সহযোগিতার সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো বেশ কঠিন। 
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও টানাপোড়েন চলছে। বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগসহ সব ধরনের সহযোগিতার জন্যই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা জরুরি। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের কোনো সামরিক জোটে যোগদান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবেও নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। 

বাংলাদেশের উচিত, সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক, সহযোগিতা রাখা। দেশের সামরিক বাহিনীকে আরো আধুনিক, সময়োপযোগী করা দরকার। তুরস্ক থেকে আধুনিক  প্রযুক্তি কেনা বা সৌদি আরবের সঙ্গে জ্বালানি খাতে সম্পর্ক বাড়ানোও জরুরি।

কিন্তু এসবের জন্য কোনো সামরিক জোটে নাম লেখাতে হবে কেন? কেন দূরের বা অন্য অঞ্চলের কোনো দেশ আক্রান্ত হলে কারো পক্ষ নিয়ে বাংলাদেশকে যুদ্ধে নামার আগাম অঙ্গীকার করতে হবে?

বরাবরই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো কোনো জোটে বা কারো পক্ষে না গিয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া। ওয়াশিংটন, বেইজিং, লন্ডন, মস্কো, দিল্লি, রিয়াদ— বিভিন্ন ইস্যুতে তারা পরস্পরের প্রতিযোগী হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ তাদের সবার সঙ্গেই সুসম্পর্ক রেখে বন্ধু হিসেবে থেকেছে। জোটে গেলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা নেওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই অন্ধ আবেগে বা কেবল ধর্মীয় সংহতির কথা ভেবে জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলা ঠিক হবে না। ইসলামিক মূল্যবোধ বজায় রেখেই স্বাধীনভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সম্ভব।

মক্কা চুক্তি সফল হোক বা না হোক, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ কাজ হবে এই সামরিক জোটে সরাসরি না জড়িয়ে, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বাঁচিয়ে রাখাই এই জটিল বিশ্বে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা।