Tuesday 22 September, 2026

সারের সংকটের পর ডিজেল, বড় পরীক্ষায় চাষিরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: 13:13, 22 September 2026

সারের সংকটের পর ডিজেল, বড় পরীক্ষায় চাষিরা

সারের সংকটের পর ডিজেল, বড় পরীক্ষায় চাষিরা

চলতি আমন মৌসুমে দেশের বিভিন্ন জেলায় সারের সংকট চলছে। অনেক এলাকায় সার না পেয়ে বিক্ষোভ করেছেন চাষিরা। অনেক এলাকায় বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে বীজ, কীটনাশক ও শ্রমের মজুরি বাড়ায় বেড়েছে আমন ধানের উৎপাদন খরচ। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ডিজেলের দাম বাড়ল।

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। ফলে চলতি মৌসুমেই আমন ধান উৎপাদনে খরচ যেমন বাড়বে, তেমনি সামনে শুরু হতে যাওয়া বোরো মৌসুম নিয়েও নতুন করে শঙ্কা তৈরি হলো।

আর দুই মাস পরই অর্থাৎ নভেম্বরের শেষ দিকে শুরু হবে বোরো ধানের বীজতলা তৈরির কাজ। এরপর জমি প্রস্তুত থেকে ধান কাটার আগ পর্যন্ত প্রায় পুরো মৌসুমেই সেচের প্রয়োজন হবে। দেশে প্রায় ৮০ শতাংশ সেচ কার্যক্রম ডিজেলনির্ভর। মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে বোরো থেকে। ফলে ডিজেলের দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি বোরো ধানের উৎপাদন খরচে পড়বে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, উৎপাদন খরচ বাড়লে আর কৃষক সেই অনুযায়ী ধানের দাম না পেলে বোরো চাষে অনীহা তৈরি হতে পারে। এতে একদিকে কৃষকের আয় কমবে, অন্যদিকে চালের সরবরাহ ও বাজারদরে চাপ তৈরি হবে। 

সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। এর আগে চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়েছিল। অর্থাৎ পাঁচ মাসের ব্যবধানে লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম বেড়েছে ৩৫ টাকা।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন। এর মধ্যে প্রায় ২৪ শতাংশ বা ১০ লাখ ৪৪ হাজার টন ব্যবহৃত হয় কৃষিকাজে। কৃষিতে ডিজেলের ব্যবহার শুধু সেচের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, ফসল কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও কৃষিপণ্য পরিবহনেও ডিজেল ব্যবহৃত হয়। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব উৎপাদনের প্রায় প্রতিটি ধাপেই পড়বে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, আগের দামে কৃষকের বছরে ডিজেলে ব্যয় হতো প্রায় ১২ হাজার ছয় কোটি টাকা। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ায় সেই ব্যয় বেড়ে প্রায় ১৪ হাজার ৯৪ কোটি টাকায় দাঁড়াবে। অর্থাৎ কৃষকের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় দুই হাজার ৮৮ কোটি টাকা।

এখন মাঠে রয়েছে আমন ধান। অনেক এলাকায় ধান কাটার সময় ঘনিয়ে এসেছে। এর মধ্যে ডিজেলের দাম বাড়ায় ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহনের ব্যয় বাড়বে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।

নওগাঁ জেলার হোগলবাড়ী গ্রামের কৃষক মাহবুব তালুকদার বলেন, এবার আমন চাষে সব মিলিয়ে খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর মধ্যে সার ও সেচের খরচ বেড়েছে। এখন ডিজেলের দাম বাড়ায় ধান মাড়াইয়ের খরচও বাড়বে। তিনি বলেন, ‘আমনেই যদি এত খরচ হয়, তাহলে বোরোতে কী হবে, সেটা ভাবতেই ভয় লাগে। বোরোতে সেচ লাগে অনেক বেশি। তাই এবার সেচ কম লাগে– এমন ফসল করার চিন্তা করছি।’

নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার কৃষক অজি উল্যাহ বলেন, আমনের তুলনায় বোরো ধানে সেচ অনেক বেশি লাগে। ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ ও মাড়াইয়ের খরচও বাড়বে। এতে অনেকে বোরো চাষ থেকে সরে যেতে পারেন।

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার কৃষক সিদ্দিক মিয়া বলেন, এভাবে খরচ বাড়তে থাকলে চাষাবাদ ছেড়ে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। কৃষকের খরচ বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী ধানের দাম বাড়ছে না। নিজের সম্পদ বিক্রি করে কৃষিকাজ করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশে চালের বড় উৎস বোরো। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মোট চালের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে বোরো থেকে। আর বোরো চাষ পুরোপুরি সেচনির্ভর।

কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৭৫৪টি গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি অগভীর নলকূপ এবং এক লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প রয়েছে। এসব সেচযন্ত্রের বড় অংশই ডিজেলচালিত। এ ছাড়া প্রায় ১৬ লাখ ডিজেলচালিত ছোট সেচযন্ত্র বা শ্যালো মেশিন রয়েছে। কৃষিতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির সংখ্যাও কম নয়। দেশে প্রায় ১০ হাজার কম্বাইন হারভেস্টার, কয়েক লাখ রিপারসহ মাড়াই, ঝাড়াই ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত যন্ত্র রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১৯ লাখ কৃষি যন্ত্রপাতি রয়েছে, যার প্রায় ৭৫ শতাংশ ডিজেলচালিত।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত বোরো মৌসুমকে কেন্দ্র করে ডিজেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। অর্থাৎ আগামী ডিসেম্বর থেকে যখন বোরো মৌসুমের প্রস্তুতি শুরু হবে, তখনই বাড়তি দামে ডিজেল কিনতে হবে কৃষকদের।

 

News Editor : Mehedi Shaheen