Sunday 27 September, 2026

২ বছর ধরে বন্ধ দেশের একমাত্র অ্যান্টিভেনম গবেষণা-উৎপাদন কেন্দ্র

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: 01:47, 27 September 2026

২ বছর ধরে বন্ধ দেশের একমাত্র অ্যান্টিভেনম গবেষণা-উৎপাদন কেন্দ্র

২ বছর ধরে বন্ধ দেশের একমাত্র অ্যান্টিভেনম গবেষণা-উৎপাদন কেন্দ্র

রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়ার মতো বিষধর সাপের বিষ থেকে অ্যান্টিভেনম (প্রতিষেধক) তৈরির গবেষণা হতো চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) ভেনম রিসার্চ সেন্টারে (ভিআরসি)। মাত্র চারটি সাপ নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই গবেষণাকেন্দ্রে বর্তমানে ১০ প্রজাতির প্রায় ৪০০ সাপ রয়েছে। গবেষণার মাধ্যমে তৈরি অ্যান্টিবডি প্রাণীর শরীরে পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করেও সফলতা পাওয়া গেছে।

তবে গবেষণার সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে এসে অর্থসংকটে পড়েছে দেশের একমাত্র এই ভেনম গবেষণাকেন্দ্র। গত দুই বছর ধরে ভিআরসিতে অর্থ বরাদ্দ বন্ধ রয়েছে।

বিদেশ থেকে অ্যান্টিভেনম আমদানির চেয়ে দেশীয় প্রজাতির বিষধর সাপের বিষের প্রতিষেধক দেশে উৎপাদনের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এই গবেষণা কেন্দ্রটি চালু করা হয়। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকে এই গবেষণা কেন্দ্রটির ফান্ডও বন্ধ হয়ে গেছে, বন্ধ হয়ে গেছে কার্যক্রমও।

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে নিয়মিত অর্থায়ন বন্ধ থাকায় বেতন-ভাতা, সাপের খাবার ও গবেষণার উপকরণÑসব ক্ষেত্রেই সংকট তৈরি হয়েছে। ধারদেনা করে কোনোভাবে কয়েক’শ বিষধর সাপকে বাঁচিয়ে রাখা হলেও দ্রুত অর্থের ব্যবস্থা না হলে কেন্দ্রটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তখন সাপগুলোকে বৈজ্ঞানিকভাবে নিধন করা ছাড়া উপায় থাকবে না বলে আশঙ্কা করছেন গবেষকেরা।

জানা যায়, ২০১৮ সালের মার্চে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ক্যাম্পাসে যাত্রা শুরু করে ভেনম রিসার্চ সেন্টার। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে চিকিৎসাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষধর সাপ সংগ্রহ, লালন-পালন, বিষ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং সেই বিষের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে স্থানীয় সাপের বিষের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অ্যান্টিভেনম তৈরির গবেষণা চালিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।

বর্তমানে কেন্দ্রে প্রায় ৪০০টি বিষধর সাপ রয়েছে। এর মধ্যে রাসেলস ভাইপার, পদ্মগোখরা, খৈয়া গোখরা, কালকেউটে ও শঙ্খিনীসহ বিভিন্ন প্রজাতি রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় শুরু হওয়া এই উদ্যোগে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের পাশাপাশি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা যুক্ত হন।

স্থানীয় সাপের বিষ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পাশাপাশি এর বিভিন্ন উপাদান বিশ্লেষণ করা হয়। লক্ষ্য, বাংলাদেশের সাপের বিষের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অ্যান্টিভেনম তৈরির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরি করা।

সংশ্লিষ্ট গবেষকরা জানান, গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ ছিল রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়ার বিষ থেকে অ্যান্টিবডি তৈরি। ভেনম রিসার্চ সেন্টারে সংগৃহীত বিষ ব্যবহার করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমেল ইমিউনিজেশন ল্যাবে এ কাজ করা হয়েছে।

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, তৈরি অ্যান্টিবডি প্রাণীর শরীরে পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে। এ-সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিবেদনও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে এটিকে এখনো চূড়ান্ত অ্যান্টিভেনম বা মানবদেহে ব্যবহারের উপযোগী ওষুধ বলা যাচ্ছে না। মানবদেহে ব্যবহারের আগে আরও গবেষণা, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে।

ভেনম রিসার্চ সেন্টারের সহযোগী গবেষক মিজানুর রহমান বলেন, ‘রাসেল ভাইপারের অ্যান্টিভেনম নিয়ে কাজ করেছিলাম। সেটার যে লার্নিং আমাদের মধ্যে আছে, সেই লার্নিংগুলো যদি আমরা বাকি প্রজাতিগুলোর মধ্যে ব্যবহার করি, তাহলে দেখা গেছে আমরা আগের চেয়েও আরও সময়মতো একই কাজটা করতে পারব। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গবেষণার জন্য শুরুতে পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পে ৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সাপ সংগ্রহ, আবাসন, বিষ সংগ্রহ, গবেষণাগার ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনায় এই অর্থ ব্যবহার করা হয়। পরে রাসেলস ভাইপারের বিষ থেকে অ্যান্টিবডি তৈরির জন্য দুই বছর মেয়াদি আরেকটি প্রকল্পে ৯৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ওই প্রকল্পের অনুমোদিত অর্থের প্রায় ৬৫ শতাংশ পাওয়া গিয়েছিল। অর্থের একটি অংশ না পাওয়ায় গবেষণার শেষ ধাপ বাধাগ্রস্ত হয়।

গবেষকদের দাবি, একসময় কেন্দ্রটি প্রতিবছর এক কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ পেত। তবে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে নিয়মিত অর্থায়ন বন্ধ রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, অপারেশনাল প্ল্যানের অর্থায়ন বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি গবেষণা কার্যক্রমটি এখনো স্থায়ীভাবে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে কেন্দ্রটির জন্য নিয়মিত সরকারি অর্থায়নের স্থায়ী কাঠামো তৈরি হয়নি।

অর্থসংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে কেন্দ্রের সাপগুলোর খাবারে। প্রায় ৪০০ সাপের প্রধান খাবার ইঁদুর, যা কেন্দ্রেই পালন করা হয়। গবেষকদের হিসাবে, শুধু সাপের খাবারের পেছনেই মাসে এক লাখ টাকার বেশি প্রয়োজন হয়।

ভেনম রিসার্চ সেন্টারের সহযোগী গবেষক মোহাম্মদ নোমান বলেন, ‘অর্থ সংকটে এখানকার স্টাফদের, আমরা যারা আছি, আমাদের খুব কষ্ট হচ্ছে। আগে যেভাবে শিডিউল করে খাবার দিত, তাতে অনেক পরিবর্তন করা হয়েছে, যাতে অন্তত তারা সার্ভাইভ করে থাকতে পারে।’

গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন রাসায়নিক, রিএজেন্ট ও অন্যান্য উপকরণ সংগ্রহেও সংকট তৈরি হয়েছে। অর্থের অভাবে নিয়মিত গবেষণা কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে গেলে সাপগুলোকে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়াও সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে থাকা এসব সাপ বাইরে গিয়ে স্বাভাবিকভাবে খাবার সংগ্রহ করতে পারবে না। বিষধর সাপ লোকালয়ে ছেড়ে দিলে মানুষের জন্যও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সহকারী গবেষক আব্দুল আউয়াল বলেন, ‘এদের ছেড়ে দিলে তারা এখন খাবার সংগ্রহ করে খেতে পারবে না। সুতরাং এই সাপগুলো যে এলাকায় ছাড়া হবে, সে এলাকার জন্য একটা হুমকি তৈরি হবে। হয়তো বৈজ্ঞানিকভাবে সাপগুলোকে মেরে ফেলতে হতে পারে।’

গবেষকদের আশঙ্কা, কেন্দ্রটি বন্ধ হলে শুধু কয়েক শ সাপের সংগ্রহই নষ্ট হবে না, বছরের পর বছর ধরে সংগৃহীত ভেনম, গবেষণার তথ্য, নমুনা এবং গবেষকদের অর্জিত অভিজ্ঞতাও হারিয়ে যেতে পারে।

 

News Editor : Shahrina Sharmin